শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

আন্তর্জাতিক হকার দিবস: ফুটপাথের অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও হকারদের বেঁচে থাকার লড়াই

২৭ মে ২০২৬ • Editing Section
৯৫৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

— এস এম মেহেদী হাসান

আজ ২৬ মে, আন্তর্জাতিক হকার দিবস। রোদ, বৃষ্টি, ধুলোবালি আর উচ্ছেদের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে যারা প্রতিদিন আমাদের শহরের ফুটপাথ ও রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে বসেন, আজ তাদের অধিকার ও শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিন। বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের অধিকার রক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অনস্বীকার্য অবদানকে স্মরণ করতেই প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়।

আমাদের যান্ত্রিক শহরগুলোর সচলতার পেছনে হকারদের ভূমিকা কতখানি, অথচ নাগরিক অধিকারের খতিয়ানে তারা কতটা উপেক্ষিত, আজকের এই বিশেষ ফিচারে সেই বাস্তবতারই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: অর্থনীতির এক অদৃশ্য চালিকাশক্তি

বাংলাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে হকাররা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির (Informal Economy) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্যমতে, দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

স্বল্প আয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে হকারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এত বড় অবদান সত্ত্বেও দেশে এখনো হকারদের জন্য কোনো কার্যকর পুনর্বাসন নীতিমালা বা সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা গড়ে ওঠেনি।

ঢাকার রাজপথের দুই হকারের জবানবন্দি

ঢাকার ব্যস্ততম ফুটপাথের গল্পগুলো যেন একেকটি জীবন্ত সংগ্রামের দলিল।

গুলিস্তানের জুতো বিক্রেতা মো. রহমত আলী (৪৫) বলেন, “আমরা তো চোর-ডাকাত না, সৎ পথে কামাই করে খাই। কিন্তু এই শহরের ফুটপাথে ব্যবসা করা যে কত কষ্টের, তা শুধু আমরাই জানি। রোদ-বৃষ্টির কষ্ট তো আছেই, তার ওপর যখন-তখন পুলিশ আর সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। মালামাল জব্দ হলে পুঁজি শেষ। আমরা বিনা পয়সায় ফুটপাথে বসতে চাই না। সরকার যদি আমাদের একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে দিত আর ট্যাক্স নিত, তাহলে শান্তিতে ব্যবসা করতে পারতাম।”

ফার্মগেটের টি-শার্ট বিক্রেতা তরুণ হকার সুমন আহমেদ (২৮) জানান, “করোনার পর চাকরি হারিয়ে এই ফুটপাথেই নামতে হয়েছে। এখানে শুধু রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, প্রতিদিন তথাকথিত ‘লাইনম্যান’ আর স্থানীয় মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে বসার জায়গা থাকে না। দিন শেষে হাড়ভাঙা খাটুনির পর যা লাভ হয়, তার একটা বড় অংশই চলে যায় এই চাঁদাবাজির পেটে। আমাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, সবাই আমাদের রাস্তার জঞ্জাল মনে করে।”

নাগরিক দৃষ্টি: একজন শিক্ষার্থীর চোখে হকাররা

ফুটপাথ দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করা সাধারণ মানুষের ভাবনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান বলেন,
“ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার সময় অনেক সময় জ্যাম লাগে, এটা সত্যি। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য হকাররা একটা বড় আশ্রয়। কম দামে বই, খাতা, শার্ট বা গ্যাজেট আমরা ফুটপাথ থেকেই কিনি। হকারদের উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং হকার ও পথচারী উভয়ের সুবিধা নিশ্চিত করে পরিকল্পিত হকার জোন তৈরি করা দরকার।”

মানবাধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা

হকারদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা পারভীন। তিনি বলেন,
“হকাররাও দেশের নাগরিক এবং সংবিধান অনুযায়ী তাদেরও জীবিকা নির্বাহের অধিকার রয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ দেখি, কিন্তু স্থায়ী পুনর্বাসন দেখি না। একজন নারী হকার যখন ফুটপাথে বসেন, তখন তার জন্য টয়লেট সুবিধা বা নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। হকারদের প্রতি সমাজের এই অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে এবং তাদের শ্রমের আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।”

প্রচারণার সংকট ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব

হকারদের এই নীরব সংগ্রামের কথা মূলধারার গণমাধ্যমে কতটা উঠে আসে, সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনহার সমশাদ বলেন, “আমাদের দেশের গণমাধ্যমে হকারদের নিয়ে সংবাদ মূলত ‘রাস্তা দখল’ বা ‘যানজট’ কেন্দ্রিক নেতিবাচক শিরোনামেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু তারা যে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে, কিংবা দেশের অর্থনীতিতে তাদের বিশাল অবদান রয়েছে, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন খুব একটা দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক হকার দিবসে গণমাধ্যমের দায়িত্ব হওয়া উচিত হকারদের মানবিক সংকট ও টেকসই নীতিমালার প্রয়োজনীয়তাকে নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা।”

আইনি জটিলতা ও নীতিমালার দাবি

হকারদের সুরক্ষায় কার্যকর আইনি কাঠামোর অভাবকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা। সিরাজগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন রীমা বলেন, “হকাররা দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করলেও তাদের জন্য এখনো সুস্পষ্ট কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। ফলে উচ্ছেদ, হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আইনি প্রতিকার পান না। সরকার যদি নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেয়, তাহলে যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে, তেমনি তাদের জীবনও কিছুটা নিরাপদ হবে।”

সিলেট জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মালিক বলেন, “ফুটপাথ অবশ্যই পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে, তবে জীবিকার অধিকারও একটি মৌলিক মানবাধিকার। উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও হকারদের জন্য পৃথক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা ব্যবস্থাপনা চালু করা প্রয়োজন। বলপ্রয়োগ করে উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন, নির্ধারিত হকার জোন এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর তদারকির মাধ্যমে এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব।”

ঠিক এই আইনি ও প্রশাসনিক সংকটের বাস্তব রূপ এবং এর স্থায়ী সমাধানের পথ বাতলে দিয়েছেন হকারদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের শীর্ষ নেতা, বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম। তিনি হকারদের দীর্ঘদিনের দাবি ও ক্ষোভ তুলে ধরে বলেন, “উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এটি কেবল হকারদের পেটে লাথি মারা এবং চাঁদাবাজদের পকেট ভারী করার একটি সাময়িক প্রক্রিয়া মাত্র। আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি—হকারদের পুনর্বাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘জাতীয় হকার নীতিমালা’ তৈরি করা হোক।

সরকার যদি প্রতিটি হকারকে আইডেন্টিটি কার্ড দিয়ে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসে, তবে কারা প্রকৃত হকার তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। আমরা ফুটপাথ বা রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে নই; আমরা চাই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট কিছু রাস্তা ‘হকার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করুক এবং উন্নত দেশের মতো ‘হলিডে মার্কেট’ বা ‘নাইট মার্কেট’ চালুর আইনি স্বীকৃতি দিক। এতে একদিকে যেমন ফুটপাথে শৃঙ্খলা ফিরবে, হকাররা চাঁদাবাজির হাত থেকে বাঁচবে, অন্যদিকে সরকারও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পাবে।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: কেন জরুরি পরিকল্পিত পুনর্বাসন

অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, হকাররা যদি হঠাৎ ব্যবসা বন্ধ করে দেন, তাহলে দেশের খুচরা বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং বেকারত্বও বাড়বে। তাই শহরকে সচল ও সুশৃঙ্খল রাখার স্বার্থেই এই অনানুষ্ঠানিক খাতকে পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টাইম-শেয়ারিং পদ্ধতি, নাইট মার্কেট বা হলিডে মার্কেট চালুর মাধ্যমে ফুটপাথের ব্যবসাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব।

শেষ কথা

ফুটপাথের ওই ছোট্ট চৌকিতে বসে যে মানুষটি আমাদের জন্য সুলভ দামে পানির বোতল, ফল কিংবা জামাকাপড় এগিয়ে দেন, তার জীবন শুধু ব্যবসার নয়, টিকে থাকারও সংগ্রাম। আন্তর্জাতিক হকার দিবসে তাই প্রত্যাশা একটাই, শহরের সৌন্দর্যের নামে আর কোনো হকার যেন পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় না থাকেন।

উচ্ছেদ নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক পুনর্বাসন ও আইনি স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের শ্রমকে মর্যাদা দেওয়াই হোক একটি মানবিক ও আধুনিক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

আরাফাতের ময়দানে লাখো মুসল্লি: হজের মূল মহিমা ও বিদায়ী খুতবার শিক্ষা

৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ: তদন্তে পুলিশ, এলাকায় ক্ষোভ ও সামাজিক উদ্বেগ

আজ বিশ্ব মৌমাছি দিবস: মৌমাছি হারালে কী হবে পৃথিবীর?

সিজোফ্রেনিয়া কী? লক্ষণ, চিকিৎসা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

আন্তর্জাতিক চা দিবস: সুবাসের কাপে বিশ্ব অর্থনীতি, জলবায়ু সংকট ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

থাইরয়েড রোগ: লক্ষণ, চিকিৎসা ও নারীদের ঝুঁকি

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ২৫ মে যেভাবে বদলে দেয় মুক্তিযুদ্ধের প্রচারযুদ্ধ

কমনওয়েলথ দিবস: ইতিহাস, বর্তমান ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের ভূমিকা

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন