চায়ের রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর সফর: উৎসবের আড়ালে দীর্ঘ বঞ্চনার প্রশ্ন
এস এম মেহেদী হাসান
দীর্ঘ ১৩ বছর পর মৌলভীবাজার জেলায় দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা জেলাজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বহুল প্রতীক্ষিত সফরকে ঘিরে মৌলভীবাজার শহর এবং পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল সেজেছে এক নতুন রূপে। চারদিকে চলছে ব্যাপক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে রাস্তাঘাট। চায়ের দেশের মানুষ তাঁদের প্রিয় নেতা তথা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
জানা গেছে, এই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যবদলের মেগা প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (তৃতীয় পর্যায়) কর্মসূচির দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। তিনি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়ন এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের জনসাধারণের মাঝে এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির শুভ সূচনা করবেন। পাশাপাশি, এই সফরের মাধ্যমে বিগত নির্বাচনের আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দেওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট রূপরেখা প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরবেন বলে জেলার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশা করছেন।
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে পূর্ণাঙ্গ নিলাম কেন্দ্রের নামে অবহেলা!
যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে সর্বত্র আনন্দের হাওয়া, তবে জেলার কিছু মৌলিক অধিকার ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে রয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
চায়ের রাজধানীর এই বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিনিয়র সাংবাদিক কাওছার ইকবাল বলেন,
“মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি পূর্ণাঙ্গ চা নিলাম কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফাঁড়ি বাগানসহ যে জেলায় ১১৪টি চা বাগান রয়েছে, যে অঞ্চলটিকে দেশের ‘চায়ের রাজধানী’ বলা হয়, সেই শ্রীমঙ্গল তথা মৌলভীবাজারবাসী এখনও চরম অবহেলার শিকার। একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চা নিলাম কেন্দ্রের দাবি আজও শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “চা উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার জেলায় স্থানান্তর করা প্রয়োজন। যেখানে উৎপাদন হবে, সেখানেই থাকা উচিত চা উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয়।”
সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস: খালেদা জিয়ার ৪ সফর বনাম শেখ হাসিনার সফরনামা
মৌলভীবাজার জেলার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চারবার মৌলভীবাজারে সরকারি সফরে আসেন। পক্ষান্তরে, মৌলভীবাজার আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সালে দেশত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ মেয়াদের শাসনামলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৌলভীবাজারে সশরীরে এসেছেন মাত্র দুইবার (২০১২ ও ২০১৩ সালে)।
বেগম খালেদা জিয়ার সফর ও মেগা প্রকল্পসমূহ
তৎকালীন প্রভাবশালী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং মৌলভীবাজারের কৃতি সন্তান এম সাইফুর রহমানের আমন্ত্রণে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২, ২০০৪, ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর করেন। ১৯৯২ সালের সফরে তিনি সিলেটকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে ঘোষণার ঐতিহাসিক ভিত তৈরি করেন। ২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি সশরীরে এসে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান।
তবে তাঁর আমলের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মেগা উদ্বোধনটি ছিল ২০০৪ সালের ৫ এপ্রিল। মার্কিন বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি ইউনোকাল (পরবর্তীতে শেভরন) পরিচালিত ‘মৌলভীবাজার গ্যাস ফিল্ড ও গ্যাস সঞ্চালন লাইন’-এর আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। কমলগঞ্জের মাগুরছড়া সংলগ্ন গ্যাস ফিল্ড এলাকার সেই জমকালো অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ. কে. এম. মোশাররফ হোসেন এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এরপর ২০০৫ সালের ১৮ মে সফরে এসে তিনি মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।
(উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান।)
শেখ হাসিনার সফর ও উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফর করেন। এই সফরে তিনি এম সাইফুর রহমানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা ‘মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল’-এর নতুন ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভা থেকে তিনি শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এরপর ২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর শেখ হাসিনা তাঁর দ্বিতীয় সফরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় আসেন। বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠের জনসভা থেকে তিনি এতিম প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্য নির্মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মৌলভীবাজার জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, ইটাউড়ী মহিলা দাখিল মাদ্রাসা ও চান্দগ্রাম এইউ দাখিল মাদ্রাসার একাডেমিক ভবন এবং জুড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের তিনতলা একাডেমিক ভবনের উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি বড়লেখা থানা ভবন, কাঁঠালতলী-মাধবকুণ্ড সড়ক পুনর্নির্মাণ, বড়লেখায় ৫০০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম-কাম-মাল্টিপারপাস হল, জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন এবং ৩৩/১১ কেভি মৌলভীবাজার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র-২-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
মৌলভীবাজার পৌরবাসীর সমস্যা
পৌরসভাগুলোর চিত্র আরও করুণ। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কাউন্সিলর এবং মেয়র পদ বিলুপ্ত করার পর থেকে নাগরিক দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বর্তমানে মেয়র নেই, কাউন্সিলর নেই; জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদসহ নিত্যদিনের নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। সচেতন মহলের মতে, সরকার চাইলে এসব স্থানে দক্ষ প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারত কিংবা দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারত। কিন্তু কোনোটিই না হওয়ায় দিন দিন নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম মৌলভীবাজার সফর হলেও জেলার মানুষের সুখ-দুঃখে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস অনেক পুরোনো।
২২ বছর আগে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে মৌলভীবাজারে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে এসেছিলেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৬নং একাটুনা ইউনিয়নে।
সেখানে তিনি বন্যাদুর্গত ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে পুনর্বাসন সহায়তার অংশ হিসেবে নিজ হাতে ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। একই সঙ্গে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের আহ্বান জানান।
একাটুনার সেই ছাগল বিতরণ কর্মসূচি আজও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে জেলার নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।
জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনহার সমশাদ জেলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের অবহেলিত সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন,
“মৌলভীবাজার শহরে দূরপাল্লার ও আন্তঃজেলা পরিবহনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এটি বর্তমানে পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অনীহার কারণে চালুর পর থেকেই টার্মিনালটি অব্যবহৃত রয়ে গেছে। ফলে শহরের বিভিন্ন স্থানে এখনও রাস্তার ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়, যা যানজটের অন্যতম কারণ। রাজধানী ঢাকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অথচ মৌলভীবাজারে আধুনিক টার্মিনাল থাকা সত্ত্বেও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।”
কুদালীছড়া এবং অন্যান্য জলাধারের বিষয়ে তিনি বলেন,
“কুদালীছড়া খনন করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর কোনো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার হয়ে শেরপুর পর্যন্ত সড়কটি দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক লাইফলাইনের জন্য এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, জগন্নাথপুর এলাকায় বহু বছর আগে গৃহীত আবাসন প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করাও জরুরি।”
মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম শেফুল বলেন,
“প্রথমে রাজনগরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। রাজনগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানা ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং রাজনগর উপজেলা সদরকে পৌরসভায় উন্নীত করা।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনগরবাসী আশাবাদী যে, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান তাঁদের ন্যায্য দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরবেন।”
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কুণ্ড বলেন, “চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং চা বাগানের ভূমির অধিকার ও মালিকানার প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সফরে চা শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেবেন এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন।”
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “বিগত দীর্ঘ ১৭ বছর মৌলভীবাজারে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। জেলাটিকে চরম অবহেলার শিকার হতে হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র চার মাসের মাথায় আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে আসছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং আশাবাদী যে, তিনি মৌলভীবাজারের স্থবির হয়ে পড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেবেন এবং দ্রুত তা বাস্তবায়ন করবেন।”
পর্যটন খাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন,
“মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন জেলা। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। এছাড়া মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার মানুষকে ট্রেনে যাতায়াত করতে হলে শ্রীমঙ্গল স্টেশন ব্যবহার করতে হয়।”
তিনি দাবি জানান, “পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ কমাতে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে অনতিবিলম্বে পর্যাপ্ত টিকিট কোটা বরাদ্দ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।”
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন,
“বিএনপি সবসময় দেশের প্রকৃত উন্নয়ন করে থাকে। মৌলভীবাজারে বিগত সময়ে যে টেকসই উন্নয়ন হয়েছে, তা মৌলভীবাজারের কৃতি সন্তান, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের হাত ধরেই হয়েছে।”
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে তিনি বলেন, “তারেক রহমান একজন জনবান্ধব নেতা। দেশের উন্নয়নই তাঁর মূল ভাবনা। তাঁর এই আগমনে আমরা আনন্দিত ও উদ্বেলিত।”
জেলা যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন উজ্জ্বল মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর জেলার উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিনের অবহেলিত মৌলভীবাজারের ভাগ্যোন্নয়নে এই সফর মাইলফলক হয়ে থাকবে। তরুণ ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নজর দেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
তিনি আরও বলেন, “মৌলভীবাজারে একটি সার্ভে ইনস্টিটিউট, একটি প্যাথলজি ইনস্টিটিউট এবং আকবরপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের।”
যুবসমাজের আরেকটি দাবির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মৌলভীবাজার পৌরসভাকে একটি আধুনিক ডিজিটাল সিটিতে রূপান্তর করার দাবিও দীর্ঘদিনের।”
নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ
সমাজকর্মী ও নারী অধিকারকর্মী ছাবিকুন নাহার ডলি বলেন, ২০০৯ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস সংকটের অজুহাতে সারা দেশে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চল থেকে গ্যাস সরবরাহ হলেও স্থানীয়রা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে মাঠপর্যায়ের নাগরিক দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে খেলাফত মজলিস মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক খিজির মুহাম্মদ জুলফিকার বলেন,
“মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাজিরবাজার খেয়াঘাট দিয়ে প্রতিদিন তিনটি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে নদী পারাপার করেন।” বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এখানে চলাচল করা যেন এক মহা বিপদ।”
দীর্ঘদিনের দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, “কাজিরবাজার খেয়াঘাটে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের বহু বছরের।”
তাঁর অভিযোগ, “জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের আগে এখানে এসে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের বড় বড় আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তাঁদের আর কোনো খোঁজ থাকে না।”
জামায়াতে ইসলামী মৌলভীবাজার জেলা শাখার সেক্রেটারি ইয়ামির আলী বলেন,
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনে আমরা মৌলভীবাজারবাসী আনন্দিত। দীর্ঘদিন ধরে জেলাটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে আমরা কিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা প্রত্যাশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “কুশিয়ারা নদীর ভাঙন রোধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ, বালাগঞ্জ খেয়াঘাট সেতু নির্মাণ, রাজনগর উপজেলাকে পৌরসভা ঘোষণা, মনু নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ এবং একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা জেলার অন্যতম প্রধান দাবি। এছাড়া চা উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয় মৌলভীবাজারে স্থানান্তরের দাবিও রয়েছে।”
দি মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসান আহমেদ জাবেদ বলেন,
“মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরে অবস্থিত শ্রীহট্ট স্পেশাল ইকোনমিক জোন এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার যুবকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজের ধীরগতির কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করতে সরকারি নীতিমালা সহজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।”
এক. মৌলভীবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা।
দুই. একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণ।
তিন. ঐতিহাসিক শমশেরনগর বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করা এবং এর অবকাঠামো আধুনিকায়ন।
চার. শ্রীমঙ্গলে পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চা নিলাম কেন্দ্র বাস্তবায়ন এবং চা উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারে স্থানান্তর।
পাঁচ. সদর উপজেলার কাজিরবাজার খেয়াঘাটে ফুটওভার ব্রিজ এবং কুশিয়ারা নদীর ওপর বালাগঞ্জ খেয়াঘাট সেতু নির্মাণ।
ছয়. স্থানীয় সরকার ও পৌরসেবা সচল করতে দ্রুত নির্বাচন অথবা বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ।
সাত. মৌলভীবাজার শহরের যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং ঢাকা-সিলেট রেলপথে ডাবল লাইন স্থাপন।
আট. শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে পর্যাপ্ত টিকিট কোটা বরাদ্দ।
নয়. পরিত্যক্ত আধুনিক বাস টার্মিনাল চালু এবং জগন্নাথপুর আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
দশ. কুদালীছড়াসহ বিভিন্ন হাওর ও খালের খনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
এগার. রাজনগর উপজেলাকে পৌরসভায় উন্নীত করা, সুপেয় পানির লাইন স্থাপন এবং দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান।
বারো. শ্রীহট্ট স্পেশাল ইকোনমিক জোন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন।
তেরো. মৌলভীবাজারসহ সিলেট অঞ্চলে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ প্রদান।
শেরপুরের ঐতিহাসিক নির্বাচনী জনসভার কয়েক মাস পর এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই মৌলভীবাজার সফর ঘিরে জেলার মানুষের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে।
চায়ের রাজধানীর মানুষ মনে করছেন, এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা, প্রশাসনিক স্থবিরতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক সংকট নিরসনের নতুন সম্ভাবনার দ্বারও হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ১৭ জুনের এই বহুল আলোচিত সফরে মৌলভীবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার কতটুকু প্রতিফলন ঘটে এবং জেলার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য কী নতুন দিকনির্দেশনা আসে। জেলাবাসীর আশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর মৌলভীবাজারের উন্নয়ন অভিযাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।