শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬৫৭ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান | ১৭ জুন, বিশ্ব কুমির দিবস

কুমির পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীবিত প্রাণীগুলোর একটি। ডাইনোসরের যুগ পেরিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৪ কোটি বছর ধরে টিকে থাকা এই সরীসৃপ আজ নিজেই টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং মানুষ-প্রাণীর সংঘাতের কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কুমিরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় প্রতি বছর ১৭ জুন পালিত হয় ‘বিশ্ব কুমির দিবস’ (World Crocodile Day), যার মূল লক্ষ্য কুমির সংরক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশেও কুমির কেবল একটি বন্যপ্রাণী নয়, বরং দেশের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে কুমিরের ভূমিকা অপরিসীম।

কোটি বছরের পুরোনো এক প্রাণী

বিজ্ঞানীদের মতে, কুমিরজাতীয় প্রাণীর ইতিহাস প্রায় ২৪ কোটি বছরের পুরোনো। বর্তমানে পৃথিবীতে কুমিরজাতীয় প্রাণীর ২৪টি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃত কুমির, অ্যালিগেটর, কেইম্যান ও ঘড়িয়াল।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবিত সরীসৃপ হলো নোনা পানির কুমির (Saltwater Crocodile)। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কুমিরের দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং ওজন এক টনেরও বেশি হয়। অন্যদিকে পশ্চিম আফ্রিকার বামন কুমির পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট কুমির প্রজাতি।

প্রকৃতিতে কুমিরকে শীর্ষ শিকারি (Apex Predator) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নদী, খাল ও জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য রক্ষায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে কুমিরের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে তিন প্রজাতির কুমির পাওয়া যেত। এগুলো হলো নোনা পানির কুমির (Saltwater Crocodile), মিঠা পানির কুমির বা মাগার (Mugger Crocodile) এবং ঘড়িয়াল (Gharial)।

বর্তমানে সুন্দরবনে প্রাকৃতিকভাবে টিকে আছে নোনা পানির কুমির। বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বন্য পরিবেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২১০টি নোনা পানির কুমির রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

অন্যদিকে মিঠা পানির কুমির বাংলাদেশের বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘি, বিভিন্ন চিড়িয়াখানা এবং সাফারি পার্কে এদের সীমিত সংখ্যক সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

ঘড়িয়াল বাংলাদেশের সবচেয়ে সংকটাপন্ন কুমিরজাতীয় প্রাণী। একসময় পদ্মা ও যমুনা নদীতে দেখা গেলেও বর্তমানে এদের সংখ্যা অত্যন্ত কম।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে কুমিরের গুরুত্ব

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কুমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করায় তারা দুর্বল ও অসুস্থ প্রাণী শিকার করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অঞ্চলে কুমিরের উপস্থিতি সেই অঞ্চলের জলাভূমির স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

কিন্তু বন উজাড়, নদী দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের অনুপ্রবেশের কারণে কুমিরের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। ফলে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

করমজল প্রজনন কেন্দ্রের সাফল্য

সুন্দরবনে কুমিরের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০২ সালে বাগেরহাটের করমজলে কুমির প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ডিম সংগ্রহ, কৃত্রিম ইনকিউবেশনের মাধ্যমে বাচ্চা ফোটানো এবং নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত লালন-পালনের ব্যবস্থা রয়েছে।

পরবর্তীতে এসব কুমিরকে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে অবমুক্ত করা হয়। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দুই শতাধিক কুমির বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন বিভাগ ও আইইউসিএন যৌথভাবে কুমিরের চলাচল ও আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং প্রযুক্তিও ব্যবহার শুরু করেছে। গবেষকরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে সুন্দরবনে কুমিরের প্রকৃত বিচরণক্ষেত্র এবং প্রজনন আচরণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।

মানুষ ও কুমিরের সংঘাত

বাংলাদেশে কুমির সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষ ও কুমিরের সংঘাতও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘিতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। চলতি বছর একটি শিশুর মৃত্যু এবং এর আগে একটি কুকুরকে কুমিরের আক্রমণের ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে বন বিভাগ ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কুমিরটিকে করমজল প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তর করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন মানুষের সংস্পর্শে থাকা এবং বার্ধক্যজনিত কারণে প্রাণীটির আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, কুমির মূলত বন্য ও স্বভাবগতভাবে শিকারি প্রাণী। তাই ধর্মীয় বিশ্বাস, পর্যটন বা লোকজ সংস্কৃতির কারণে তাদের মানুষের খুব কাছাকাছি রাখলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে হুমকির মুখে কুমির

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বেশ কয়েকটি কুমির প্রজাতি এখনো হুমকির মুখে রয়েছে।

আবাসস্থল ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, অবৈধ শিকার এবং কুমিরের চামড়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই সংকটের অন্যতম কারণ। অনেক দেশে পর্যটন ও বাণিজ্যিক খামারে কুমির পালনের ক্ষেত্রেও প্রাণী কল্যাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংরক্ষণবিদরা বলছেন, কুমিরকে শুধু ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং পরিবেশ রক্ষায় তাদের গুরুত্ব বুঝে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

শেষ কথা

বিশ্ব কুমির দিবস শুধু একটি প্রাণীকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; এটি প্রকৃতির এক প্রাচীন বাসিন্দাকে রক্ষার অঙ্গীকার। কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই প্রাণী মানুষের সৃষ্টি নানা সংকটের মুখে আজ অস্তিত্বের লড়াই করছে।

বাংলাদেশে সুন্দরবনের নোনা পানির কুমির এখনো টিকে আছে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হলে আবাসস্থল সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কারণ কুমিরকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন