ধু ধু বালুচর নাকি সবুজ পৃথিবী: কোন পথে আমরা?
এস এম মেহেদী হাসান
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো কোনো মাঠে এখন গ্রীষ্মের দুপুরে ফেটে যাওয়া মাটির চিত্র দেখা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় কৃষকেরা লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করছেন। দেশের বিভিন্ন নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘ বালুচর। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমির অবক্ষয় ও পানিসংকটের এই বাস্তবতায় প্রতি বছর ১৭ জুন পালিত হয় জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস (World Day to Combat Desertification and Drought)।
দিবসটির উদ্দেশ্য শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি নয়; বরং ভূমির অবক্ষয়, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশন (UNCCD) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি কোনো না কোনো মাত্রায় অবক্ষয়ের শিকার। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন এবং পানিসম্পদের ওপর।
প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ উর্বর জমি উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে। বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত চাষাবাদ, খনিজ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ভূমির অবক্ষয় অব্যাহত থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
খরা এখন আর শুধু আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি খরার ঘটনা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব বিশ্বজুড়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশকে সাধারণত নদীমাতৃক ও সবুজ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এখানে মরুকরণ বলতে সাহারার মতো বিশাল মরুভূমি তৈরি হওয়াকে বোঝায় না; বরং ভূমির উর্বরতা কমে যাওয়া, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস, পানিসংকট এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরের কিছু এলাকা খরাপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে।
দেশের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ এখনো সেচনির্ভর। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকায় অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা না গেলে ভবিষ্যতে পানিসংকট আরও প্রকট হতে পারে। এ কারণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় নদী আন্তসীমান্ত বা অভিন্ন নদী। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানির প্রবাহ কমে গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ে। নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেলে শুধু নৌপথ নয়, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরে নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মরুকরণের আরেকটি রূপ দেখা যাচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। কোথাও কোথাও ফসলের ধরন পরিবর্তন করতে হচ্ছে, আবার অনেক এলাকায় লবণসহিষ্ণু জাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ, মাটির জৈবগুণ বজায় রাখা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার প্রসার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে আধুনিক সেচব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব প্রযুক্তি ও জাত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
ভূমি শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি খাদ্য, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ভিত্তি। ভূমির অবক্ষয় বাড়তে থাকলে এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়বে।
বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস আমাদের সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম একটি সবুজ, বাসযোগ্য পৃথিবী পাবে, নাকি পানিসংকট ও ভূমি অবক্ষয়ের আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
লেখক: এস এম মেহেদী হাসান
গবেষক ও মুক্ত লেখক