মাগুরাছড়া ট্র্যাজেডি: ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের আগুন, জাতীয় সম্পদ লুট আর অনুত্তরিত প্রশ্ন
এস এম মেহেদী হাসান
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে কিছু ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, জাতীয় বেদনার অংশ। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন দিবাগত রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরাছড়া গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও মাগুরাছড়ার আগুন শুধু একটি গ্যাসকূপ নয়, পুড়িয়ে দিয়েছিল জাতীয় সম্পদ, বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের একটি বড় অংশ।
আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেই বিপর্যয়ের প্রকৃত দায় কার? কেন বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারেনি? আর কেন এই ঘটনাকে ঘিরে উত্থাপিত দুর্নীতি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ক্ষতিপূরণ বঞ্চনার অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি?
১৯৯৭ সালের ১৪ জুন দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে মাগুরাছড়া খাসিয়াপুঞ্জি এলাকায় মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল (Occidental) পরিচালিত ১৪ নম্বর গ্যাসকূপে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ ফুট উঁচু আগুনের শিখা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের পর গ্যাসকূপটিতে টানা কয়েক মাস আগুন জ্বলতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বহু কিলোমিটার দূর থেকেও আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যেত।
ঘটনার পরপরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। কারণ এটি শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা ছিল না, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি ও পরিবেশ বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছিল।
মাগুরাছড়া বিস্ফোরণের পর সরকারি তদন্ত কমিটি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে আসে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট (BCF) প্রাকৃতিক গ্যাস আগুনে পুড়ে যায়।
তৎকালীন বাজারমূল্যে এই গ্যাসের মূল্য ছিল প্রায় ৩,৯০০ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর মূল্য কয়েকগুণ বেশি, যা সহজেই দশ হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এটি শুধু গ্যাসের ক্ষতি নয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি ছিল বৈদেশিক মুদ্রা, শিল্পায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
মাগুরাছড়া বিস্ফোরণের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হয় লাউয়াছড়া বনাঞ্চল।
বিভিন্ন গবেষণা ও পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্যমতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ৮৫ একর এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আশপাশের আরও ৪৬ একর বনভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিরল প্রজাতির বৃক্ষ, ঔষধি উদ্ভিদ এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণী আগুনে পুড়ে মারা যায়।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আধার। বিপন্ন উল্লুকসহ বহু প্রাণীর আবাসস্থল এই বনাঞ্চল আজও সেই ক্ষতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন।
বিস্ফোরণের তাপে সিলেট-আখাউড়া রেলপথের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।
মাগুরাছড়া খাসিয়াপুঞ্জির বসতঘর, পানের বরজ এবং জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। অনেক পরিবার দীর্ঘ সময় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় পর্যায়ে ঘটনাটি আলোচিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কখনোই সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
মাগুরাছড়া বিস্ফোরণের পর তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি তোলে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে অক্সিডেন্টালের কাছ থেকে প্রায় ১৩,৯৮৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষতিপূরণ কেন আদায় করা গেল না?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া গেলে বাংলাদেশ অধিকতর ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারত। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রভাবের কারণে বিষয়টি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
ফলে রাষ্ট্র, পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগণ তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়।
বিস্ফোরণের পর অক্সিডেন্টাল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।
পরে গ্যাস ব্লকের দায়িত্ব যায় ইউনোকাল (Unocal)-এর কাছে এবং পরবর্তীতে বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেভরন (Chevron) এর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এই মালিকানা পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ এবং পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করে আসছেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত সামাজিক উন্নয়ন তহবিল এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিতভাবে পাননি।
মাগুরাছড়া ট্র্যাজেডির পরবর্তী সময় এবং গ্যাস ব্লক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমকে ঘিরে সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও সাবেক উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, আন্দোলনকারী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, গ্যাস ব্লক এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের অর্থ বণ্টনে অনিয়ম হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত অভিযোগও আলোচনায় এসেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিচারিক ও অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, মাগুরাছড়া ট্র্যাজেডির ক্ষতিপূরণ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় উন্নয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেনি। তাদের মতে, জাতীয় সম্পদের এই ক্ষতির দায় শুধু বহুজাতিক কোম্পানির নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নীতিনির্ধারকদেরও।
মাগুরাছড়া ট্র্যাজেডির প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেছে।
কিন্তু এখনো কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি:
মাগুরাছড়া কেবল একটি গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, পরিবেশ সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ইতিহাসে একটি বড় সতর্কবার্তা।
২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, ধ্বংসপ্রাপ্ত বনভূমি, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী জনপদ এবং হাজার কোটি টাকার জাতীয় ক্ষতির এই অধ্যায় আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
১৪ জুন এলেই আগুনের সেই শিখা হয়তো আর দেখা যায় না, কিন্তু জাতীয় সম্পদ রক্ষা, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দায় নির্ধারণের প্রশ্নগুলো এখনো জ্বলছে।
মাগুরাছড়ার প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ ও জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে সেই ট্র্যাজেডির প্রতি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।