শেষ বিকেলের আলো: প্রবীণ স্বাস্থ্য, ফিটনেস ও আমাদের সামাজিক বাস্তবতা
বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবসে বাংলাদেশের প্রবীণ সমাজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
— এস এম মেহেদী হাসান
ধাবমান সময়ের চাকা আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মৌলিক প্রশ্নটি এখানেই—এই বাড়তি আয়ু কি আমাদের প্রবীণদের জন্য আনন্দের, নাকি একাকীত্ব আর ব্যাধির বোঝায় নুয়ে পড়া এক দীর্ঘশ্বাস? মে মাসের শেষ বুধবারে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’ (National Senior Health & Fitness Day)। প্রবীণদের শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রফুল্লতা এবং সক্রিয় জীবনযাপনের জোরালো বার্তা নিয়ে আসে এই দিনটি। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি আজ গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’ (National Senior Health & Fitness Day) আজ বিশ্বজুড়ে প্রবীণদের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সক্রিয় জীবনযাপনের একটি অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
দিবসটি সর্বপ্রথম শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ খাত বিষয়ক একটি জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র প্রথম এই দিবসটির সূচনা করে। সংস্থাটি প্রবীণদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্থানীয় কমিটিকে এক ছাতার নিচে এনে এই বিশেষ সচেতনতামূলক দিনটি চালু করে।
দিবসটি প্রতি বছর কোনো নির্দিষ্ট তারিখে পালিত হয় না। মে মাসকে বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিকভাবে ‘প্রবীণ নাগরিক মাস’ (Senior Citizens Month) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রবীণদের দীর্ঘ এক মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের একটি সফল সমাপ্তি টানতে মে মাসের শেষ বুধবারটিকে বেছে নেওয়া হয়।
এই দিবসের মূল স্লোগান হলো—“If you don’t use it, you lose it” (শরীরকে সচল না রাখলে, তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে যাবে)। প্রবীণরা যেন অলস বসে না থেকে কম দূরত্বের হাঁটা প্রতিযোগিতা (Senior Walk), হালকা অ্যারোবিক্স বা যোগব্যায়ামের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী রাখতে পারেন, সেটাই এর লক্ষ্য।
বাংলাদেশে প্রবীণদের সংখ্যা প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী দেশের প্রবীণদের বর্তমান চিত্রটি নিম্নরূপ:
| সূচক | বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস |
|---|---|
| বর্তমান প্রবীণ জনসংখ্যা | মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৫% থেকে ১০% (সংখ্যায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ)। |
| গড় আয়ু বৃদ্ধি | বর্তমানে দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২.৩ থেকে ৭২.৮ বছরে পৌঁছেছে। |
| ২০২৯ সালের পূর্বাভাস | বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পা দেবে ‘প্রবীণপ্রবণ’ (Aging Society) সমাজে। |
| ২০৫০ সালের পূর্বাভাস | দেশ রূপ নেবে ‘প্রবীণপ্রধান’ সমাজে; প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন হবেন প্রবীণ (২২%)। |
দেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন এবং জীবিকার তাগিদে সন্তানদের দূরে থাকার কারণে প্রবীণ আবাসের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে নিবন্ধিত বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০টি, যা ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল (আবাসন সক্ষমতা মাত্র ২-৩ হাজার)। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিপুল সংখ্যক প্রবীণের এক বা একাধিক সন্তান আলাদা থাকেন, যার ফলে বহু প্রবীণ তীব্র একাকীত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
ফিচারের এই অংশে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, মনস্তত্ত্ব, পেশাগত ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত সমাধান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা:
ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল মারুফ (এফসিপিএস-মেডিসিন, এফএসিপি-ইউএসএ, এমআরসিপিএস-গ্লাসগো; সহযোগী অধ্যাপক, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মৌলভীবাজার):
“বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা বাতের ব্যথার মতো ক্রনিক রোগ বাসা বাঁধে। তবে বার্ধক্য কোনো রোগ নয়, এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। এই বয়সে ফিট থাকতে নিয়মিত সুষম খাদ্য, পরিমিত ঘুম এবং প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটাচলা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে প্রবীণদের সুস্থতার সবচেয়ে বড় ওষুধ হলো মানসিক শান্তি। পরিবার ও সমাজের উচিত তাঁদের সাথে সবসময় শিশুর মতো কোমল ও যত্নশীল ব্যবহার করা। পাশাপাশি, জেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার সাথে আধুনিক প্রবীণনিবাস গড়ে তোলা সময়ের দাবি।”
ডা. নিয়াজ মোস্তফা (প্রবীণ রোগ বিশেষজ্ঞ ও জেরিয়াট্রিশিয়ান):
“আমাদের দেশে ধারণা করা হয় বয়স ৬০ পার হলেই সব শেষ। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। প্রবীণদের ফিট থাকতে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ প্রয়োজন। তবে তাদের পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান নজর দেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, একাকীত্বই প্রবীণদের সবচেয়ে বড় রোগ।”
মোহাম্মদ আবদুল বাছির (বাছির জামাল) (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট):
“আজ ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমি দেশের সকল প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সুস্বাস্থ্য কামনা করি। সাংবাদিকদের শেষ বয়সের চিকিৎসা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাস্ট আন্তরিকভাবে কাজ করছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের বড় ধরনের রোগের চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমরা বিশেষ ‘হেলথ কার্ড’ বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ভাতার ব্যবস্থা করছি। শুধু প্রবীণরাই নন, পর্যায়ক্রমে দেশের সকল সাংবাদিকদের জন্যই এই হেলথ কার্ডের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, প্রবীণ সাংবাদিকদের শেষ জীবনের আর্থিক সুরক্ষায় একটি সম্মানজনক ‘অবসর ভাতা’ বা পেনশন স্কিম চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাশের অপেক্ষায় রয়েছে, খুব শীঘ্রই এটি চালু হবে।”
খায়রুজ্জামান কামাল (মহাসচিব, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম):
“দীর্ঘ ৪৫ বছর সাংবাদিকতায় থাকার পর ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে অবসর নিয়েছি। দেশের একজন সিনিয়র নাগরিক ও সাংবাদিক হিসেবে মনে করি, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি নাগরিকের পাশাপাশি সিনিয়র সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য অধিকার লাভের সকল প্রকার উদ্যোগ রাষ্ট্রের করা উচিত। সাংবাদিকতা একটি সার্বক্ষণিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়ায় সাংবাদিকরা দ্রুত শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দেশে সাংবাদিকতা পেশায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকায় তাঁরা বেশি মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকরা আহত বা নির্যাতনের শিকার হলে অধিকাংশ মিডিয়া হাউস পাশে দাঁড়ায় না। সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য রক্ষায় মিডিয়া হাউস, সাংবাদিক সংগঠন ও সরকারকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”
নেছার উদ্দিন (সিনিয়র সহ-সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি):
“সাংবাদিকতা পেশার কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম ও মানসিক চাপের কারণে গণমাধ্যমকর্মীরা খুব দ্রুত বার্ধক্যে পা দেন এবং নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হন। ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমাদের দাবি—প্রবীণ সাংবাদিকদের শুধু বিশেষ দিবসে অনুদান দেওয়া নয়, বরং তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি স্থায়ী ‘জরুরি স্বাস্থ্য তহবিল’ গঠন করা হোক। মফস্বল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি প্রবীণ সাংবাদিক যেন শেষ বয়সে বিনা চিকিৎসায় অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব।”
আনহার সমশাদ (সাধারণ সম্পাদক, জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন):
“প্রবীণ বয়সে পুরুষের চেয়ে বেশি নিঃসঙ্গতায় ভোগেন পরিবারের নারী সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর শূন্যতায় মানসিক কষ্টের পাশাপাশি শারীরিক নানারকম সমস্যার কথা মায়েরা শেয়ার করতে পারেন না। দুর্ভাগ্যক্রমে পরিবারে যদি বউ-শাশুড়ির বনিবনার অভাব থাকে, তবে প্রবীণ নারীরা অবর্ণনীয় যন্ত্রণার শিকার হন। দুই প্রজন্মের পরিবারের হাল ধরা নারী সদস্যের এই পারিবারিক অন্তর কলহের কারণে সন্তানেরাও মায়ের মনোকষ্ট ও শারীরিক অসুস্থতার কথা জানতে পারেন না। ফলে ঘরে ঘরে প্রবীণ মায়েদের পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা ও স্মৃতিভ্রংশের (ডিমেনশিয়া) মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। হাজারো অপ্রকাশিত প্রবীণ নারীদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা সমাধানের জন্য পরিবারের গৃহকর্তাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের মনিটরিং সেল গঠন করা জরুরি।”
টিএইচএম জাহাঙ্গির (সাধারণ সম্পাদক, সিলেট রত্ন ফাউন্ডেশন):
“প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, বরং আমাদের শিকড় ও অমূল্য সম্পদ। আজ ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তাদের মানসিক প্রফুল্লতা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক প্রবীণ শেষ বয়সে এসে অবহেলা আর একাকীত্বে ভোগেন, যা তাদের দ্রুত অসুস্থ করে তোলে। আমরা ‘সিলেট রত্ন ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রবীণদের সম্মাননা ও স্বীকৃতি দিয়ে আসছি, যেন তারা অনুভব করতে পারেন যে সমাজ এখনো তাদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। প্রবীণদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানো এবং তাদের সম্মানিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান—আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রবীণদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলি।”
মো. আব্দুল মালিক (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাইস্কুল, জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট):
“বিশ্বের সকল প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে আমি শুধু এটুকুই বলব—বয়স বাড়লে মানুষ আবার শিশুর মতো অবুঝ হয়ে পড়ে। তাই প্রবীণদের সাথে সবসময় শিশুর মতোই কোমল ও ধৈর্যশীল ব্যবহার করুন, তাঁদের একাকীত্ব দূর করুন। আর সময়ের প্রয়োজনে প্রবীণদের সুচিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দেশে আরও বেশি আধুনিক ও সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত প্রবীণনিবাস গড়ে তোলা দরকার, যেন জীবনের শেষ বিকেলটা তাঁদের জন্য কষ্টের না হয়।”
আব্দুল বাছিত চৌধুরী (৭০) (সাবেক সভাপতি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, মৌলভীবাজার):
“আজকের এই বিশেষ দিবসে পৃথিবীর সকল প্রবীণের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বয়সের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আবার শিশুর মতো অবুঝ ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই পরিবারের সবার প্রতি আমার অনুরোধ—প্রবীণদের অবহেলা না করে তাঁদের সাথে শিশুর মতোই কোমল ও ধৈর্যশীল ব্যবহার করুন। পাশাপাশি, সময়ের বাস্তবতায় প্রবীণদের শেষ জীবনে সুচিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে দেশে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আধুনিক প্রবীণনিবাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।”
আফরোজা তালুকদা (সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক মানবতার কন্ঠ):
“আজ ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমাদের মনে রাখা দরকার—আজকের শিশুই আগামী দিনের প্রবীণ। অথচ বর্তমান সমাজে প্রবীণদের অনেক সময় বোঝা ভাবা হয়। প্রবীণরা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধের ধারক। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগে তাঁদের চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণবান্ধব চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, বরং সম্পদ; তাঁদের সুস্থ, সম্মানজনক ও আনন্দময় জীবন নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”
এডভোকেট মোঃ বাবুল হাওলাদার (আইনজীবী, জেলা জজকোর্ট খুলনা):
“প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়, এটি তাঁদের আইনি অধিকার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতিগত দিক উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশে ‘পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে, যেখানে সন্তানদের জন্য মা-বাবার ভরণ-পোষণ ও চিকিৎসার যত্ন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধানও আছে। তবে কেবল আইন দিয়ে প্রবীণদের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, কোনো প্রবীণ যেন আইনি বা সামাজিকভাবে নিগৃহীত না হন। প্রবীণদের আইনি সহায়তা সহজ করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সবার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।”
মোক্তাদির হোসাইন (পরিচালক, মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি):
“আজকের প্রবীণরাই আমাদের বর্তমান সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথপ্রদর্শক। ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, বয়সের ভারে প্রবীণরা যখন শিশুর মতো সংবেদনশীল হয়ে পড়েন, তখন তাঁদের প্রতি আমাদের আচরণও হওয়া উচিত অত্যন্ত যত্নশীল ও মায়াপূর্ণ। তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, বেসরকারি খাতেরও এগিয়ে আসা উচিত। প্রবীণদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত প্রবীণনিবাস এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তুলতে করপোরেট সেক্টরকে তাদের সামাজিক কল্যাণ তহবিল থেকে বিনিয়োগ ও অনুদান বাড়াতে হবে। সকল প্রবীণের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ কামনা করি।”
রিহাম চৌধুরী (শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, অনার্স ১ম বর্ষ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ):
“অর্থনীতির শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, প্রবীণরা সমাজের অনুৎপাদনশীল কোনো গোষ্ঠী নন, তাঁরা আমাদের বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন। আজ ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য ও ফিটনেস নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের জন্যও জরুরি। আমাদের মৌলভীবাজারসহ সারা দেশেই এখন একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে, যার ফলে প্রবীণরা মানসিক ও শারীরিকভাবে একা হয়ে পড়ছেন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো—পরিবারের ও সমাজের প্রবীণদের একাকীত্ব দূর করা, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে সচেতন থাকা এবং তাঁদের সাথে সময় কাটানো। যে সমাজ প্রবীণদের সম্মান ও সুস্থতা দিতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।”
রাব্বি হোসেন রকি (এআই ইঞ্জিনিয়ার ও সফটওয়্যার ডেভেলপার):
“চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ধরে রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং আধুনিক প্রযুক্তি এক অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারে। স্মার্ট রিস্টব্যান্ড, এআই-চালিত হেলথ ট্র্যাকার বা দূরবর্তী রোগী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার (Remote Monitoring) মাধ্যমে প্রবীণদের রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বা অক্সিজেনের মাত্রা এখন ঘরে বসেই সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এমনকি কোনো প্রবীণ মানুষ যদি একা থাকা অবস্থায় হঠাৎ পড়ে যান বা স্ট্রোক করেন, তবে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিবার বা হাসপাতালের কাছে জরুরি অ্যালার্ট পৌঁছে দেওয়া যায়। কম্পিউটার সায়েন্সের একজন স্নাতক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে প্রবীণদের একাকীত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে আমাদের আরও বেশি প্রবীণবান্ধব এবং সহজবোধ্য অ্যাপ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার প্রবীণদের শেষ জীবনকে অনেক বেশি নিরাপদ, স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে পারে।”
একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
পার্ক, ফুটপাত ও হাঁটার জায়গাগুলোকে প্রবীণবান্ধব করা। গণপরিবহন ও সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘প্রবীণ কর্নার’ চালুর মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।
প্রবীণ নারীদের অদৃশ্য শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বুঝতে শাশুড়ি-বউয়ের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো পরিবারকে মায়াপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
প্রবীণদের একাকীত্ব কাটাতে এবং নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা ও ট্র্যাকিংয়ের জন্য এআই চালিত ও সহজবোধ্য দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
সাংবাদিকদের জন্য প্রস্তাবিত পেনশন ও হেলথ কার্ডের মতো দেশের সকল খাতের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ভাতা এবং সার্বজনীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, তাঁরা আমাদের শিকড় এবং আলোকবর্তিকা। ‘বিশ্ব প্রবীণ স্বাস্থ্য ও ফিটনেস দিবস’-এ আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—কেবল একটি দিন উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বছরের প্রতিটি দিন যেন আমরা আমাদের প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল হই। প্রবীণদের একটি সুরক্ষিত, সুস্থ ও হাসিখুশি জীবন উপহার দেওয়া কোনো দয়া নয়, বরং এটি তাঁদের অধিকার এবং আমাদের পরম কর্তব্য।
আন্তর্জাতিক হকার দিবস: ফুটপাথের অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও হকারদের বেঁচে থাকার লড়াই
আরাফাতের ময়দানে লাখো মুসল্লি: হজের মূল মহিমা ও বিদায়ী খুতবার শিক্ষা
আজ বিশ্ব মৌমাছি দিবস: মৌমাছি হারালে কী হবে পৃথিবীর?
সিজোফ্রেনিয়া কী? লক্ষণ, চিকিৎসা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি