শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

বিশ্ব কচ্ছপ দিবস: বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ডাইনোসর যুগের প্রাচীন কচ্ছপ, বাংলাদেশে পাচার ও বাসস্থান ধ্বংসে সংকট তীব্র

২৪ মে ২০২৬ • Editing Section
৮১৬ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

আজ ২৩ মে। বিশ্ব কচ্ছপ দিবস (World Turtle Day)। প্রায় সাড়ে ২২ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ ডাইনোসরদেরও আগের সময় থেকে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই প্রাণীটি আজ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-সমুদ্র দূষণ, অবৈধ শিকার, প্লাস্টিক দূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কচ্ছপ ও কচ্ছপজাতীয় প্রাণীরা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

২০০০ সাল থেকে ‘আমেরিকান টরটয়েজ রেসকিউ’ (ATR)-এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় কচ্ছপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, মানুষের অসচেতনতা ও চাপের কারণে তাদের অস্তিত্ব এখন সংকটাপন্ন।

কেন কচ্ছপ বাঁচানো জরুরি

কচ্ছপ জলজ বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা নদী, হাওর, পুকুর ও সমুদ্রে পচা জৈব পদার্থ, মৃত জীব এবং বিভিন্ন বর্জ্য খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বনসংরক্ষক মোঃ ছানাউল্যা পাটোয়ারী বলেন, “জলজ বাস্তুতন্ত্রে কচ্ছপ পচা জৈব পদার্থ, জলজ আগাছা ও দুর্বল মাছ খেয়ে পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।”

সামুদ্রিক কচ্ছপ সমুদ্রের তলদেশের ঘাস (Seagrass) নিয়ন্ত্রণ করে, যা সামুদ্রিক মাছের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কচ্ছপ বিলুপ্ত হলে পুরো জলজ খাদ্যচক্র ভেঙে পড়বে।

বাংলাদেশের কচ্ছপ: বৈচিত্র্য ও সংকট

বাংলাদেশে মোট প্রায় ৩০ প্রজাতির কচ্ছপ ও কাছিম পাওয়া যায়, যার অধিকাংশই বর্তমানে হুমকির মুখে। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি মিঠা পানির এবং ৫টি সামুদ্রিক প্রজাতি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বোস্তামী কচ্ছপ’ পৃথিবীতে বর্তমানে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী মাজারের পুকুরে সীমিত আকারে টিকে আছে।

তবে বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম চুরি, জালে আটকে মৃত্যু, নদী ও হাওরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা, এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আবাসস্থল সংকোচন বড় ঝুঁকি

রথীন্দ কুমার বিশ্বাস (বন অধিদপ্তর) বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও মানবসৃষ্ট চাপের কারণে কচ্ছপের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে, যা তাদের খাদ্য ও প্রজননে বড় প্রভাব ফেলছে।”

সংরক্ষণ এখনো মানুষের অগ্রাধিকারের জায়গায় নেই

— শাহরিয়ার সিজার রহমান (প্রধান নির্বাহী, ক্রিয়েটিভ কনসারভেশন অ্যালায়েন্স – CCA) “বাংলাদেশে সংরক্ষণ এখনো মানুষের অগ্রাধিকারের জায়গায় পৌঁছায়নি। নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে মানুষ ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। দেশে প্রায় ২৫ প্রজাতির কচ্ছপই বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। আমরা গত ১০-১৫ বছর ধরে গাজীপুর, বান্দরবানের থানা ও আলীকদম, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কচ্ছপ সংরক্ষণে কাজ করছি। শুধু উদ্ধার করলেই হবে না, এদের প্রজনন করিয়ে আবার বনে ফিরিয়ে দিতে হবে। কচ্ছপ সংরক্ষণে সরকার, স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতাই মূল চাবিকাঠি

— মোঃ ছানাউল্যা পাটোয়ারী (বনসংরক্ষক, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল, বন অধিদপ্তর)

“কচ্ছপ সংরক্ষণ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলমান কার্যক্রমে বন বিভাগের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি উদ্যোগও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এশিয়ান ফ্ল্যাপশেল টার্টলসহ (ধুম কাছিম) দেশীয় কচ্ছপ প্রজাতি নিয়ে বন বিভাগের সরাসরি আলাদা বড় কোনো সংরক্ষণ প্রকল্প বর্তমানে না থাকলেও, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা জু এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবন অঞ্চলে একটি বিশেষ সংরক্ষণ কার্যক্রম চলছে, যেখানে বন বিভাগ সরাসরি সহযোগিতা করছে। এই কার্যক্রমের আওতায় সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ ও জরিপ চালানো হয়েছে, যার মাধ্যমে কচ্ছপের উপস্থিতি ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

জলজ বাস্তুতন্ত্রে কচ্ছপের পরিবেশগত ভূমিকা অনস্বীকার্য। এরা মূলত পচা জৈব পদার্থ, জলজ আগাছা, দুর্বল বা অসুস্থ মাছসহ বিভিন্ন জৈব বর্জ্য খেয়ে পানির স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক কারণে পাহাড়ি ছড়া শুকিয়ে যাওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে কচ্ছপের খাদ্য ও প্রজনন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।”

তিনি কচ্ছপ শিকার বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমাধানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সনাতনী ধর্মাবলীদের ঐতিহ্যগতভাবে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এই প্রথাগত শিকার ও চাহিদা কমাতে হলে বিকল্প পুষ্টির উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। উৎসবের দিনগুলোতে যদি তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাসি বা মুরগির মাংসের জোগান ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায়, তবে কচ্ছপ শিকার ও খাওয়ার এই প্রবণতা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কমে আসবে। আইনি কড়াকড়ির পাশাপাশি এই ধরণের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই পারে ডাইনোসর যুগের এই প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে।”

খাবারের তালিকা থেকে কাছিমকে বাদ দিতে হবে

— সামিউল মোহসেনিন (ম্যানেজার, টেরিস্ট্রিয়াল কনজারভেশন প্রোগ্রাম, ওয়াইল্ডলাইফ Conservation Society – WCS বাংলাদেশ)

“বাংলাদেশে মোট ৩০ প্রজাতির কাছিম ও কচ্ছপ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুই প্রজাতির কচ্ছপ পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে এবং পাঁচ প্রজাতি সামুদ্রিক কাছিম। বাকি ২৩ প্রজাতি হচ্ছে মিঠাপানির কাছিম, যেগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ২৩ প্রজাতির কাছিমই বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত। এদের ধরা, মারা, খাওয়া বা বেচাকেনা করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও দেশে এখনো কাছিম খাওয়ার প্রচলন রয়েছে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

কাছিম জলাশয়ের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের দেহে বিভিন্ন জুনোটিক রোগজীবাণু ছড়ানোর যে ঝুঁকি থাকে, সে বিষয়েও আমাদের সচেতন থাকার প্রয়োজন রয়েছে।”

তিনি তাদের একটি সফল প্রকল্পের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে বলেন: “ডব্লিউসিএস বাংলাদেশ গত চার বছর ধরে ‘ডিমান্ড রিডাকশন ফর থ্রেটেনড টরটয়েজ অ্যান্ড ফ্রেশওয়াটার টার্টলস’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলায় পরিচালিত এই প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে কাছিম খাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রকল্পের শুরুতে আমাদের জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কাছিম খাওয়ার কথা বললেও, সচেতনতামূলক কাজের ফলে বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন্যপ্রাণী আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কাছিম সংরক্ষণে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে— কাছিম আমাদের খাবারের তালিকার প্রাণী নয়; প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থেই কাছিমকে প্রকৃতির বুকে টিকিয়ে রাখতে হবে।”

প্রজনন ও কৃত্রিম হ্যাচিংয়ের মাধ্যমে সুরক্ষার চেষ্টা চলছে

— শিহাব খালেদীন (রিসার্স অ্যান্ড প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন) “বিশ্ব কচ্ছপ দিবস উপলক্ষে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা জু এবং বন বিভাগের সহযোগিতায় কয়েক বছর ধরে ‘বাটাগুর বাসকা’ (বড় কাইট্টা) সংরক্ষণে কাজ করছে। সুন্দরবনের করমজল ও ভাওয়ালে স্থাপিত প্রজননকেন্দ্রে কৃত্রিমভাবে ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচিং করানো হচ্ছে এবং পরে সেগুলোর রিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বড় করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হচ্ছে। বনাঞ্চলের কচ্ছপের ক্ষেত্রে বন উজাড় ও অবৈধ শিকার বড় সমস্যা। আমরা স্থানীয় জেলে ও কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করছি, যাতে কোথাও কাছিম ধরা পড়লে দ্রুত বন বিভাগকে জানানো হয়।”

প্লাস্টিক ও ট্রলিংয়ের প্রভাব

সিনিয়র সাংবাদিক আনহার সামশাদ বলেন, “কচ্ছপ প্লাস্টিককে জেলিফিশ ভেবে খেয়ে ফেলে এবং ট্রলারের জালে আটকে মারা যায়। ট্রলিংয়ে TED ডিভাইস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি।”

বাস্তব অবস্থা ও ঝুঁকি নিরূপণে চলছে দেশব্যাপী গবেষণা

— শামীম আহমেদ (প্রোগ্রাম ম্যানেজার, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন) “নিরাপদ ও দূষণমুক্ত জলাশয় কাছিমের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন বর্তমানে বাংলাদেশের কাছিমের প্রকৃত অবস্থা ও ঝুঁকি নিরূপণে গভীর গবেষণা চালাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কোন প্রজাতির কাছিম কী অবস্থায় রয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। সুন্দরবনের করমজলে প্রজনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে একসময় বাংলাদেশ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা বাটাগুর বাসকা প্রজাতিটিকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।”

স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতা: বদলে যাওয়া সমুদ্র

কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলের প্রবীণ জেলে আবদুল মজিদ (৬০) জানান তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা: “আগে শীতকালে রাতে যখন সাগরে জাল ফেলতাম, কচ্ছপরা ঝাঁকে ঝাঁকে ডিম পাড়তে বালুচরে আসত। এখন সৈকতে এত হোটেল, এত আলো আর কোলাহল যে কচ্ছপ আর আসেই না। অনেক সময় মরা কচ্ছপ সাগরে ভেসে ওঠে, যেগুলোর পেটে প্লাস্টিক বা শরীরে জালের দাগ থাকে। এগুলো দেখলে খারাপ লাগে, কিন্তু সমুদ্রের এই পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে।”

সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী ‘টাইগার গনী’র অভিজ্ঞতা: হাটে-বাজারে গোপন বিক্রি

শুধু উপকূলীয় অঞ্চলই নয়, সুন্দরবনের গহীন থেকে শুরু করে সংলগ্ন লোকালয় ও স্থানীয় বাজারগুলোতেও কচ্ছপ পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। সুন্দরবনের পাশে বসবাসকারী এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় অবদানের জন্য স্থানীয়ভাবে ‘টাইগার গনী’ নামে পরিচিত আব্দুল গনি মাঝি তাঁর একটি চোখে দেখা ঘটনকারী অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

“সুন্দরবনের আশপাশ এবং বনের ভেতরের বিভিন্ন খাল থেকে শিকারিরা গোপনে কাছিম ধরে লোকালয়ের বাজারে সরবরাহ করে। কিছুদিন আগেই সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানাধীন বুধহাটা ইউনিয়নের ‘বেলেডাঙ্গা বাজারে’ পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা প্রায় ৫০টি কচ্ছপ আমরা হাতেনাতে আটকে দিই। পরে তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগকে খবর দিয়ে কচ্ছপগুলো তাদের কাছে নিরাপদ জিম্মায় হস্তান্তর করি।

কিন্তু এটা তো কেবল একটা ঘটনা। আমাদের চোখের আড়ালে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন স্থানীয় বাজারে গোপনে কচ্ছপ কেনাবেচা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় গোপনে খাবারের মেন্যু হিসেবে বিক্রির জন্য এই নিরীহ প্রাণীগুলোকে সরবরাহ করা হচ্ছে। সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে হলে এই স্থানীয় বাজারগুলোতে বন বিভাগ ও প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও ঝটিকা অভিযান চালানো দরকার।”

কচ্ছপ পাচারের মূল ‘হটস্পট’ ও ট্রানজিট রুট

বাংলাদেশে কচ্ছপ পাচার মূলত দুটি উদ্দেশ্যে হয়— অভ্যন্তরীণ বাজারে মাংস হিসেবে বিক্রির জন্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে (বিশেষ করে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও হংকং) সৌখিন পোষা প্রাণী বা ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে।

সংগ্রহের প্রধান হটস্পট: দেশের বিল, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চল (যেমন— চাঁদপুর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা)। শিকারিরা এই অঞ্চলের জলাশয় থেকে কচ্ছপ ধরে স্থানীয় গোপন আড়তে জমা করে।

অভ্যন্তরীণ রুট: চাঁদপুর, কুমিল্লা বা নোয়াখালী থেকে কচ্ছপের বড় চালানগুলো বাস বা ট্রাকে করে ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী বা নারায়াণগঞ্জে আসে। সেখান থেকে এগুলো উত্তরবঙ্গের বগুড়া (শেরপুর), রংপুর বা দিনাজপুরে পাঠানো হয়।

আন্তর্জাতিক পাচার সীমান্ত: জীবিত কচ্ছপ এবং কচ্ছপের হাড় পাচারের জন্য ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় রুটগুলো হলো— মেহেরপুর, ঝিনাইদহ (মহেশপুর), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (শিবগঞ্জ), দিনাজপুর (হিলি) এবং লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত।

আকাশপথ: বিরল প্রজাতির ছোট কচ্ছপ (যেমন: ব্ল্যাক স্পটেড টার্টল) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে লাগেজ বা কার্গোর মাধ্যমে থাইল্যান্ড, হংকং বা চীনে পাচার করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘নতুন কৌশল’ ও তদন্তের চ্যালেঞ্জ

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (WCCU) বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ-আস-সাদিক জানান, চোরাকারবারিরা এখন অত্যন্ত আধুনিক এবং চতুর কৌশল ব্যবহার করছে। তারা এখন আর হাটে-বাজারে কচ্ছপ বিক্রি করে না; বরং ফেসবুকের গোপন গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম ব্যবহার করে অনলাইন ডিলিং করে। কুরিয়ার পার্সেলে ‘ফল’ বা ‘মাছ’ নামে লুকিয়ে কচ্ছপ পাঠানো হচ্ছে। এমনকি দূরপাল্লার নৈশকোচের চালক-হেলপারদের মাধ্যমে মালিকবিহীন লাগেজ হিসেবেও পাচার করা হয়। ইদানীং জীবিত কচ্ছপের চেয়ে কচ্ছপের হাড় ও খোলস (Carapace) বস্তাভর্তি করে পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে যারা ধরা পড়ে, তারা মূলত দিনমজুর বা বাহক। WCCU এই সিন্ডিকেটের মূল ‘গডফাদার’দের ধরতে আটককৃতদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) অ্যানালাইসিস, ছদ্মবেশী তদন্ত বা ‘কন্ট্রোলড ডেলিভারি’ এবং ইন্টারপোলের (Interpol) সাথে যৌথ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে। তবে অপরাধীদের ফেক সিমের ব্যবহার এবং হুন্ডির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের কারণে অনেক সময় মূল অপরাধীদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।

উদ্ধার ও আইনি জটিলতার চ্যালেঞ্জ: সমাধান কী?

কুরিয়ার বা বাস টার্মিনাল থেকে বিপুল পরিমাণ কচ্ছপ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় অবমুক্ত করতে দেরি হয়। এই বিষয়ে অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ মম বলেন: “আইন কাগজে-কলমে অত্যন্ত কঠোর হলেও মূল সংকটটি তৈরি হয় মাঠপর্যায়ে আইনি প্রয়োগ এবং অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে। অনেক সময় জব্দকৃত কচ্ছপগুলোকে মামলার ‘আলামত’ হিসেবে দীর্ঘদিন আটকে রাখার কারণে সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেক কচ্ছপ মারা যায়। এই আইনি জটিলতা কাটাতে বর্তমান অধ্যাদেশে ডিজিটাল আলামত (যেমন- ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ছবি) এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দ্রুত সুরতহাল করে কচ্ছপগুলোকে অবিলম্বে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে। মূল গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বনবিভাগ বর্তমানে আদালতের সাথে সমন্বয় করে বিশেষ ‘Fast-track Permission’ এবং উদ্ধারের পরপরই প্রাথমিক চিকিৎসা (Triage & Rehab) প্রদানের মাধ্যমে কচ্ছপগুলোকে দ্রুত প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

কচ্ছপসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরে মিশকাতুল কোরআন মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা শেখ সাদ আহমদ আমিন বর্ণভী বলেন মাওলানা শেখ সাদ আহমদ আমিন বর্ণভী বলেন, “ইসলাম প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বলে। অযথা প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ। প্রকৃতি রক্ষা করা ধর্মীয় দায়িত্ব।”

তথ্য দিয়ে সহায়তা

বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত তথ্য ৯৯৯, বন বিভাগ বা WCCU-এর মাধ্যমে জানানো যায়। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা হয়।

উপসংহার

কচ্ছপ শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বিলুপ্তি মানে নদী, সমুদ্র ও প্রকৃতির পুরো চক্রের ক্ষতি। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই প্রাচীন প্রাণীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

লেখক পরিচিতি:
এস এম মেহেদী হাসান একজন পরিবেশ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু বিষয়ক রিপোর্টিংয়ে কাজ করেন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন