শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৮২৮ বার দেখা
শেয়ার করুন

বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, রোগীর অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তবতা

— এস এম মেহেদী হাসান

আজ ২৫ মে, বিশ্ব থাইরয়েড দিবস। মানুষের গলার ভেতরে শ্বাসনালীর সামনে প্রজাপতির মতো দেখতে ছোট্ট একটি গ্রন্থি থাকে, যার নাম ‘থাইরয়েড’। আকারে ছোট হলেও এই গ্রন্থিটি আমাদের শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, মানসিক ভারসাম্য এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এই দিবসটি পালন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নারী ও শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে।

থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ কী?

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে মূলত ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T₃) ও থাইরক্সিন (T₄) নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দন, হজম এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলেই শরীরে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েডের প্রধান রোগ ও লক্ষণ

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েডের সমস্যা মূলত দুই ধরনের:

১. হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism)

যখন থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে।

প্রধান লক্ষণ:

  • দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অলসতা
  • অল্পতেই শীত লাগা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • চুল পড়া
  • ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া
  • অনিয়মিত ঋতুস্রাব
  • মনোযোগ কমে যাওয়া

২. হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism)

যখন থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে।

প্রধান লক্ষণ:

  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • বুক ধড়ফড় করা
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • হাত-পা কাঁপা
  • অতিরিক্ত ক্ষুধা
  • খিটখিটে মেজাজ
  • ঘুমের সমস্যা
  • চোখ কিছুটা বের হয়ে আসা

এছাড়া গলগণ্ড (Goiter), থাইরয়েড নডিউল এবং থাইরয়েড ক্যান্সারও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: দেরিতে শনাক্ত হওয়াই বড় সমস্যা

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মৌলভীবাজারের কনসালটেন্ট এবং সহযোগী অধ্যাপক (ইন সিটু) ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন,

“থাইরয়েড রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মিল থাকে। ফলে রোগীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন।”

তিনি বলেন, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বুক ধড়ফড় করা, চুল পড়া বা মানসিক অস্থিরতার মতো লক্ষণকে মানুষ সাধারণ দুর্বলতা বা মানসিক চাপ ভেবে অবহেলা করেন।

“বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ বাড়ার পেছনে সচেতনতার অভাব, আয়োডিনের ঘাটতি, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে,” বলেন তিনি।

থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ে TSH, Free T₄ এবং প্রয়োজনে T₃ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

“অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমে, রোগীকে দীর্ঘদিন এমনকি সারাজীবন ওষুধ সেবন করতে হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়,” যোগ করেন তিনি।

নারীস্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের ঝুঁকি

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের প্রাক্তন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি বিভাগ) ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া বলেন,

“গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মায়ের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি থাকলে গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অকাল প্রসব, গর্ভপাত, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

“অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, বন্ধ্যাত্ব বা বারবার গর্ভপাতের পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা দায়ী হতে পারে,” বলেন তিনি।

ডাঃ প্রীতি বড়ুয়ার মতে, গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থার শুরুতেই TSH পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“বাংলাদেশে এখনো নারীস্বাস্থ্যে থাইরয়েড নিয়ে সচেতনতা পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ নারী দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন,” যোগ করেন তিনি।

সচেতনতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা

বাংলাদেশ প্রেসক্লাব লালমনিরহাট জেলা শাখার সিনিয়র সহসভাপতি এবং আশা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের কল্লোল আহমেদ বলেন,

“লালমনিরহাটের চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ থাইরয়েডের নানা জটিলতায় ভুগছেন, যাকে স্থানীয়রা ‘গ্যাগ’ বা ‘ঘ্যাগ’ বলে থাকেন। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে অনেক পরিবার একে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যায়।”

তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

“গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তৃণমূলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। পাশাপাশি কারিগরি ও সামাজিক সচেতনতামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং সময়মতো স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা জরুরি,” বলেন তিনি।

সচেতনতার ঘাটতি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনহার সমশাদ বলেন, “টেলিভিশন, পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য কনটেন্ট বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক মানুষ এখনো মনে করেন এটি খুব সাধারণ বা তেমন গুরুত্বপূর্ণ রোগ নয়। অথচ সময়মতো শনাক্ত না হলে থাইরয়েড বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম ও প্রাথমিক স্ক্রিনিং বাড়ানো গেলে অনেক

দৈনিক আমার বার্তা পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার কাজী আব্দুস সামাদ বলেন, “বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ নিয়ে সচেতনতা এখনো অনেক কম। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক দুর্বলতা, ওজনের পরিবর্তন বা মানসিক অস্থিরতাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। পরে জটিল অবস্থায় গিয়ে রোগ ধরা পড়ে।”

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিষয়ক জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।রোগী শুরুতেই চিকিৎসার আওতায় আসতে পারবেন।

রোগীর অভিজ্ঞতা: “প্রথমে বুঝতেই পারিনি”

রেজওয়ানা তাবাসসুম, নোয়াখালীর বাসিন্দা, বলেন—

“প্রথমে বুঝতেই পারিনি যে আমার থাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে। সবসময় ক্লান্ত লাগত, চুল পড়ত এবং ওজন বেড়ে যাচ্ছিল। প্রথমে মনে করেছিলাম সাধারণ দুর্বলতা বা স্ট্রেসের কারণে এমন হচ্ছে।”

পরে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোর পর তার থাইরয়েড রোগ শনাক্ত হয়।

“নিয়মিত ওষুধ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার পর এখন অনেকটা ভালো আছি। আমার মনে হয়, থাইরয়েড নিয়ে মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা দরকার,” বলেন তিনি।

রাঙ্গামাটির ডমেচিং মারমা জানান—

“শুরুতে আমি বুঝতেই পারিনি এটা থাইরয়েডের সমস্যা। সবসময় ক্লান্ত লাগত, শরীর ভারী হয়ে যেত, কাজ করার শক্তি কমে যাচ্ছিল।”

পরীক্ষার পর জানা যায় তিনি হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত।

“এখন ওষুধ খেয়ে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছি। পাহাড়ি এলাকায় এখনো এই রোগ নিয়ে সচেতনতা খুব কম,” বলেন তিনি।

নীলফামারীর শিউলি বেগম বলেন—

“প্রথমে মনে হয়েছিল সাধারণ দুর্বলতা। কিন্তু ধীরে ধীরে ওজন বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা আর মানসিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে।”

পরবর্তীতে পরীক্ষা করে তার থাইরয়েড রোগ ধরা পড়ে।

“গ্রামাঞ্চলে আমরা অনেকেই সময়মতো বুঝতে পারি না। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা খুব জরুরি,” বলেন তিনি।

সচেতনতার ওপর জোর শিক্ষকদেরও

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আব্দুল মালিক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাইস্কুল, সিলেট বলেন, “আমাদের সমাজে এখনো অনেক মানুষ থাইরয়েড রোগ সম্পর্কে সচেতন নন। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ ক্লান্তি বা ওজন পরিবর্তনের মতো লক্ষণকে সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন।”

তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তুলতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও হরমোনজনিত রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া উচিত,” বলেন তিনি।

কেন বাড়ছে থাইরয়েড রোগ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ বাড়ছে:

  • আয়োডিনের ঘাটতি
  • অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস
  • মানসিক চাপ
  • অটোইমিউন সমস্যা
  • বংশগত কারণ
  • অনিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

প্রতিরোধ ও করণীয়

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ:

  • আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা
  • সুষম খাদ্য গ্রহণ করা
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ না করা
  • গর্ভধারণের আগে TSH পরীক্ষা করা
  • দীর্ঘদিন ক্লান্তি বা ওজন পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া

শেষ কথা

বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড রোগ কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সামান্য রক্ত পরীক্ষা যেমন TSH ও Free T₄ পরীক্ষার মাধ্যমেই দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।

বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে চিকিৎসকেরা তাই সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন