স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ২৫ মে যেভাবে বদলে দেয় মুক্তিযুদ্ধের প্রচারযুদ্ধ
১৯৭১ সালে কলকাতার বালিগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এই বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’
— এস এম মেহেদী হাসান
১৯৭১ সালের মে মাস। বাংলাদেশজুড়ে তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, দমন-পীড়ন ও ভয়াবহ অনিশ্চয়তা। ঠিক সেই সময় ইথারে ভেসে আসে এক কণ্ঠ— “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি…”
এই কণ্ঠ শুধু সংবাদ পাঠ করত না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাহস, প্রতিরোধ ও মনোবলের প্রতীক।
আজ ২৫ মে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ও নিয়মিত সম্প্রচার শুরুর ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে কলকাতার বালিগঞ্জে মুজিবনগর সরকারের অধীনে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে এই বেতার কেন্দ্র, যা একাত্তরে পরিণত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অস্ত্রে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ চালু করা হয়।
পরবর্তীতে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ২৭ মার্চ এই কেন্দ্র থেকেই মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
৩০ মার্চ পাকিস্তানি বিমান হামলায় কালুরঘাট কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেলে এর প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
কালুরঘাট ধ্বংস হওয়ার পর বেতারের শব্দসৈনিকেরা সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছান। পরে মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বালিগঞ্জে নতুন স্টুডিও স্থাপন করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মে, কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে এখান থেকে ৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার শুরু হয়।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, নাট্যকার ও বেতারকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
এম আর আখতার মুকুলের “চরমপত্র” ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। ঢাকাইয়া উপভাষায় ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনায় পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য তুলে ধরা হতো।
কল্যাণ মিত্রের রাজনৈতিক রূপকধর্মী নাটক “জল্লাদের দরবার” পাকিস্তানি শাসকদের ব্যঙ্গ করে নির্মিত হয়েছিল।
“জয় বাংলা, বাংলার জয়”, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”, “পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে”সহ বহু কালজয়ী গান এই কেন্দ্র থেকেই প্রচারিত হতো।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পাকিস্তানি প্রচারণার বিপরীতে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরত। এটি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনোবল ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিভিন্ন সময় গান ও বিশেষ বার্তার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সাংকেতিক নির্দেশনাও পৌঁছে দেওয়া হতো।
ভারতের আকাশবাণী, বিশেষ করে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবাদ ও ভাষ্যও একাত্তরে বাঙালির অন্যতম তথ্যভরসা হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেই প্রচারিত হয়। বালিগঞ্জের ছোট্ট স্টুডিও থেকে শুরু হওয়া সেই শব্দযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বিজয়ের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তাদের কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাই ২৫ মে শুধু একটি তারিখ নয়, এটি শব্দে লেখা প্রতিরোধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।