শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

কমনওয়েলথ দিবস: ইতিহাস, বর্তমান ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের ভূমিকা

২৫ মে ২০২৬ • Editing Section
৭১২ বার দেখা
শেয়ার করুন

— এস এম মেহেদী হাসান

আজ ২৪ মে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের কিছু দেশে ঐতিহাসিকভাবে ‘কমনওয়েলথ দিবস’ বা সাবেক ‘এম্পায়ার ডে’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। যদিও আধুনিক কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে বর্তমানে মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার এই দিবসটি পালিত হয়, তবুও ২৪ মে তারিখটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখনো বিদ্যমান।

সাবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে ৫৬টি স্বাধীন রাষ্ট্রের এই জোট আজ বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্কই বা কতটা গভীর—এই ফিচারে সেই দিকগুলোই তুলে ধরা হলো।

ইতিহাস: যেভাবে শুরু হয় কমনওয়েলথ দিবস

কমনওয়েলথ দিবসের শিকড় ‘এম্পায়ার ডে’ উদযাপনের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঐক্য ও বিস্তারকে স্মরণ করতে ১৯০২ সালে এই দিবস পালনের ধারণা আসে। ১৯০৪ সাল থেকে রানী ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন (২৪ মে) উপলক্ষে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হতে শুরু করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ‘এম্পায়ার ডে’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কমনওয়েলথ দিবস’ ঘোষণা করেন। উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদী ধারণা থেকে সরে এসে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সমান অংশীদারিত্বকে তুলে ধরা।

১৯৭৭ সাল থেকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার বিশ্বব্যাপী ‘কমনওয়েলথ দিবস’ পালিত হবে। তবে কিছু দেশে ২৪ মে তারিখটি এখনো ঐতিহাসিকভাবে স্মরণ করা হয়।

বর্তমান নেতৃত্ব

কমনওয়েলথের কাঠামোতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে।

কমনওয়েলথের প্রধান (Head of the Commonwealth): এটি মূলত প্রতীকী পদ। বর্তমানে এ পদে আছেন যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস।

কমনওয়েলথ সেক্রেটারি-জেনারেল: সংস্থার প্রশাসনিক নেতৃত্বে রয়েছেন ডমিনিকান বংশোদ্ভূত প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড।

বর্তমান বিশ্বে কমনওয়েলথের কার্যকারিতা

আধুনিক ভূরাজনীতিতে কমনওয়েলথকে নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ একে কেবল একটি আলোচনামঞ্চ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এর কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকার কথা বলেন।

তবুও কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব স্পষ্ট—

ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠস্বর

৫৬ সদস্য দেশের মধ্যে বহু দেশই ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র। জাতিসংঘ বা জি-২০-এর মতো বড় মঞ্চে যাদের প্রভাব সীমিত, তাদের জন্য কমনওয়েলথ একটি সমান কণ্ঠস্বরের প্ল্যাটফর্ম।

জলবায়ু ইস্যু

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কমনওয়েলথ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ‘কমনওয়েলথ ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যাক্সেস হাব’ ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে।

গণতন্ত্র ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ

সদস্য দেশগুলোতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল পাঠায়।

বাংলাদেশের ভূমিকা

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল কমনওয়েলথের ৩২তম সদস্য হিসেবে যোগ দেয়—যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থায় অন্তর্ভুক্তি, জাতিসংঘের আগেই।

সক্রিয় অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (CPA)-এর বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে।

জলবায়ু ও যুব নেতৃত্ব

বাংলাদেশ কমনওয়েলথ যুব ফোরাম ও জলবায়ু কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশে কমনওয়েলথের প্রভাব

রোহিঙ্গা ইস্যু

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কমনওয়েলথ শুরু থেকেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে (CHOGM) যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। কমনওয়েলথভুক্ত শক্তিশালী দেশগুলো (যেমন যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া) আন্তর্জাতিক আদালতে (ICJ) গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আর্থিক ও আইনি সমর্থন দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবেলা:

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। কমনওয়েলথ তার ‘ক্লাইমেট ফাইন্যান্স স্কিম’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ ছাড় করাতে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। এছাড়া সমুদ্র অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ সুরক্ষায় কমনওয়েলথ ব্লু চার্টার (Commonwealth Blue Charter)-এর আওতায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

বাণিজ্য সুবিধা

যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো কমনওয়েলথভুক্ত উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা (GSP) পেয়ে আসছে, যা আমাদের তৈরি পোশাক খাতের (RMG) প্রসারে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।

উপসংহার

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস থেকে জন্ম নিলেও আধুনিক কমনওয়েলথ এখন ৫৬টি দেশের প্রায় আড়াইশ কোটি মানুষের একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চ। এখানে ধনী-দরিদ্র বা বড়-ছোট রাষ্ট্রের পার্থক্য নয়, বরং সমান অংশীদারিত্বই মূল ধারণা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করতে কমনওয়েলথ এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করে চলেছে।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন