শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

আন্তর্জাতিক চা দিবস: সুবাসের কাপে বিশ্ব অর্থনীতি, জলবায়ু সংকট ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

২২ মে ২০২৬ • Editing Section
৯৭০ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান, ২১ মে — পানির পর বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় চা। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে সন্ধ্যার আড্ডা, ক্লান্তি দূর করা থেকে অতিথি আপ্যায়ন—জীবনের প্রতিটি স্তরেই চায়ের উপস্থিতি যেন এক অনিবার্য সংস্কৃতি। কিন্তু এক কাপ চায়ের পেছনে জড়িয়ে আছে বিশাল এক বৈশ্বিক অর্থনীতি, কোটি মানুষের জীবিকা, নারীর ক্ষমতায়ন, শ্রমিকের সংগ্রাম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা।

চা শুধু পানীয় নয়; এটি ইতিহাস, বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং টেকসই উন্নয়নেরও প্রতীক। তাই আন্তর্জাতিক চা দিবস কেবল চা পানের আনন্দ উদযাপনের দিন নয়; বরং এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কোটি মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিন।

ইতিহাসের পথ ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

২০০৫ সাল থেকে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কেনিয়া ও মালয়েশিয়াসহ প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে ১৫ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ পালন করে আসছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল চা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক বাজারে টেকসই বাণিজ্যের দাবি জোরালো করা।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ভারত সরকার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা Food and Agriculture Organization (FAO)-এর কাছে দিবসটিকে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব তোলে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ ২১ মে’কে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২০ সালে প্রথমবার বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়।

মে মাসকে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে বাস্তব কারণ। বাংলাদেশ, ভারতসহ অধিকাংশ চা উৎপাদনকারী দেশে এ সময়ই চা পাতা সংগ্রহের প্রধান মৌসুম বা ভরা মরশুম।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দিবস?

জাতিসংঘের মতে, আন্তর্জাতিক চা দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকটি বড় বৈশ্বিক লক্ষ্য।

বিশ্বের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সরাসরি চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এদের বড় অংশই ক্ষুদ্র চাষি ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে চা শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চা বাগানের অধিকাংশ শ্রমিক নারী হওয়ায় এই খাত নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও বড় অবদান রাখছে। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে চা উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চাষ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

পাঁচ হাজার বছরের এক যাত্রা

ধারণা করা হয়, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীনে চায়ের উৎপত্তি। কিংবদন্তি অনুসারে, চীনা সম্রাট শেন নুং-এর ফুটন্ত পানিতে বুনো পাতার কয়েকটি অংশ উড়ে এসে পড়ে। সেই পানীয় পান করে তিনি এক নতুন স্বাদ ও সতেজতা অনুভব করেন। সেখান থেকেই চায়ের সূচনা।

১৬৫০ সালের দিকে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। পরে ব্রিটিশদের মাধ্যমে ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশে চায়ের বিস্তার ঘটে, যা তৎকালীন ঔপনিবেশিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের চা শিল্প: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে প্রথম চায়ের চারা রোপণ করা হয় ১৮৪০ সালে, চট্টগ্রামের ডিসি বাংলোর পাশে। তবে ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে শুরু হয় প্রথম বাণিজ্যিক উৎপাদন।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে চা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন ও চাহিদার চমৎকার সামঞ্জস্যের কারণে বাংলাদেশ এখন চা উৎপাদনে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের চা উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ মৌসুমে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে।

বর্তমানে চা উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৯ম। বিশ্বের শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় চীন, ভারত, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কা প্রথম সারিতে রয়েছে। বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ৮ম ও ৯ম অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি চায়ের সুনাম ধরে রাখতে উৎপাদন বৃদ্ধি, মান উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট ও দিনাজপুরে সমতলের ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসছে এই সমতল অঞ্চল থেকে।

অর্জনের পাশাপাশি বড় সংকটও আছে

চা শিল্পে উৎপাদন বাড়লেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পুরোপুরি স্বস্তির নয়।

বাংলাদেশ চা বোর্ড ও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জলবায়ু পরিবর্তন। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে চায়ের ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ বা মৌসুমের প্রথম কুঁড়ি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে উৎপাদন খরচও দ্রুত বাড়ছে। শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, সার ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। অথচ চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গল নিলামে অনেক ভালো মানের চাও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। এতে ছোট ও একক মালিকানাধীন বাগানগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে নিম্নমানের চোরাই চা দেশে প্রবেশ করা। এতে দেশীয় চায়ের বাজারমূল্য আরও কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ বাগান মালিকদের।

জলবায়ু মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা

বাংলাদেশ চা বোর্ড ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বাগান এলাকায় কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং), ছায়াতরু রোপণ বাধ্যতামূলক করা এবং খরাসহনশীল নতুন ক্লোন উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিটিআরআই ইতোমধ্যে BT-1 থেকে BT-23 পর্যন্ত ২৩টি ক্লোন এবং ৪টি বাই-ক্লোনাল বীজ জাত উদ্ভাবন করেছে। সাম্প্রতিক ক্লোনগুলো, বিশেষ করে BT-22 ও BT-23, খরাসহনশীল এবং উত্তরাঞ্চলের মাটির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

উত্তরাঞ্চলের নতুন বিপ্লব

একসময় চা মানেই ছিল কেবল সিলেট কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখন সেই ধারণা বদলে দিয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল।

পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষুদ্র চাষিরা নিজেদের জমিতে সফলভাবে চা চাষ করছেন। চা বোর্ড সেখানে ‘ক্যামেলিয়া ডাইজেস্ট’ নামের মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে। পাশাপাশি চাষিদের সুবিধার্থে আঞ্চলিক কার্যালয়, ভ্রাম্যমাণ সয়েল টেস্টিং ল্যাব এবং ‘পঞ্চগড় অনলাইন চা নিলাম কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে।

তবে সেখানেও বাস্তব সমস্যা রয়ে গেছে। চাষিদের অভিযোগ, স্থানীয় ফ্যাক্টরি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে তারা অনেক সময়ই কাঁচা পাতার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।

রপ্তানির নতুন লক্ষ্য: গ্রিন টি ও ওলং টি

একসময় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চা রপ্তানি করলেও এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা বছরে প্রায় ৯.৫ থেকে ১০ কোটি কেজিতে পৌঁছেছে। ফলে সাধারণ ব্ল্যাক টি রপ্তানি কমে এসেছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ‘গ্রিন টি’ ও ‘ওলং টি’ রপ্তানির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি চা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং বিভিন্ন এশীয় দেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

একইসঙ্গে ই-অকশন (e-Auction) ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের নিলাম প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও উন্মুক্ত করা হয়েছে।

শ্রমিকদের জীবন: সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি

চা শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও মূল চালিকাশক্তি হলেন বাগান শ্রমিকরা। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০২২ সালে চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। কিন্তু বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এই মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন।

বাগানের আবাসন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও রয়েছে গুরুতর সংকট। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির অভাব তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা চালু করা প্রয়োজন, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বঞ্চনার চক্র ভাঙা সম্ভব হয়।

এক কাপ চায়ের ভেতরে যে বিশ্ব

চা শুধু একটি তৃপ্তিদায়ক পানীয় নয়। এর প্রতিটি চুমুকের পেছনে জড়িয়ে আছে কৃষি, অর্থনীতি, শ্রম, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু সংকট এবং লাখো মানুষের বেঁচে থাকার গল্প।

আন্তর্জাতিক চা দিবসের এই বিশেষ দিনে তাই এক কাপ চায়ের সুবাস উপভোগ করার পাশাপাশি আমাদের স্মরণ করা প্রয়োজন সেই শ্রমিকের ঘাম, সেই ক্ষুদ্র চাষির সংগ্রাম এবং এই শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎকে—যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

এক কাপ চায়ের সুবাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্রম, সংগ্রাম, প্রকৃতি ও অর্থনীতির বিশাল এক বিশ্ব।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন