শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬৬২ বার দেখা
শেয়ার করুন

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হাওর ও জলাভূমির জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভেতর সুনামগঞ্জ জেলার গুরই হাওর এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়, বরং কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সংস্কৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। সম্ভাবনার পাশাপাশি এই হাওর নানা সমস্যারও মুখোমুখি।

ভৌগোলিক অবস্থান ও বিস্তৃতি

গুরই হাওর সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত। এটি মূলত ধর্মপাশা, জগন্নাথপুর ও শাল্লা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার হেক্টর এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে এই হাওরের তলদেশ পরিণত হয় উর্বর কৃষিজমিতে।

হাওরের চারপাশে ছোট-বড় অসংখ্য গ্রাম রয়েছে, যা বর্ষায় দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাগরা, ঢোলাই নদীসহ স্থানীয় খালগুলো এই হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে পানি দ্রুত বাড়ে, যা মাছ ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রাচীনকাল থেকেই হাওরভিত্তিক জীবনব্যবস্থা এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গুরই হাওরও এর ব্যতিক্রম নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষি, মাছ ধরা ও নৌপথে যোগাযোগ এই হাওরকেন্দ্রিক।

ভাটিয়ালি গানসহ লোকসংগীতে হাওরের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বোরো ধান চাষ করেন, আর বর্ষায় দেশীয় মাছের প্রাচুর্য স্থানীয় মানুষের জীবিকার বড় উৎস হয়ে ওঠে।

প্রধান সমস্যা

অকাল বন্যা ও ফসলহানি: এপ্রিল-মে মাসে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামলে বোরো ফসল ডুবে যায়। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়।

মাছের প্রজাতি হ্রাস: একসময় রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোলসহ নানা দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা কমে গেছে। অবৈধ জাল ব্যবহার ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে।

অপর্যাপ্ত অভয়াশ্রম: মাছ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নেই, ফলে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দখল ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ: হাওরের অনেক বিল প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় জেলেরা স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে পারেন না।

কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার: অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও সার ব্যবহারে পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে, যা মাছের প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অবকাঠামোর অভাব: বর্ষায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়।

সম্ভাবনা

কৃষি: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ ফলনশীল ধান ও ভাসমান কৃষির সম্ভাবনা রয়েছে।

মৎস্যসম্পদ: অভয়াশ্রম বৃদ্ধি ও অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা গেলে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

পর্যটন: বর্ষায় হাওর পরিণত হয় বিশাল জলরাশিতে, যেখানে দ্বীপের মতো ভাসে গ্রামগুলো। নৌভ্রমণ, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।

সংস্কৃতি: ভাটিয়ালি গান, নৌকা বাইচ ও হাওর মেলা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

করণীয়

  • টেকসই বাঁধ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা
  • মাছের অভয়াশ্রম বৃদ্ধি ও অবৈধ জাল বন্ধ করা
  • দখলমুক্ত করে জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করা
  • কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ
  • পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ
  • সড়ক নির্মাণে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা

উপসংহার

গুরই হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি সুনামগঞ্জের মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। এর সম্ভাবনা বিশাল, তবে সমস্যাগুলো সমাধান না করলে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। গুরই হাওর রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

প্রতিবেদক: এস এম মেহেদী হাসান। তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি স্থানীয় ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক গবেষণা এবং প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন হাওরের সমস্যা ও সম্ভাবনা, পাহাড় ও বনভূমির ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং মৎস্যসম্পদ বিলুপ্তির মতো বিষয় নিয়ে তার প্রতিবেদন বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি E Bangla 71-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন