শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬৬৮ বার দেখা
শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গয়ঘর গ্রাম। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই জনপদে সাড়ে পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর স্থাপনা—স্থানীয়দের কাছে যা ‘খোজার মসজিদ’ নামে পরিচিত। সুলতানি আমলের এই স্থাপনাটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং ইতিহাস, জনশ্রুতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়।

মসজিদের দেয়ালে সংরক্ষিত কালো পাথরের শিলালিপি অনুযায়ী, এটি নির্মিত হয় ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে (৮৮১ হিজরি)। সে সময় বাংলার সিংহাসনে ছিলেন স্বাধীন সুলতান শামসউদ্দীন ইউসুফ শাহ। তৎকালীন শ্রীহট্ট অঞ্চলের শাসনকর্তা মজলিস আলম মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে শিলালিপি থেকে জানা যায়। শিলালিপিতে তার পিতামহ হাজি আমিরের নামও উল্লেখ আছে, যা তার পারিবারিক মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়।

স্থাপত্যে সুলতানি ধাঁচের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। বর্গাকার গঠন, প্রায় ২৪ হাত দৈর্ঘ্য-প্রস্থ এবং তিন থেকে চার ফুট পুরু দেয়াল—সব মিলিয়ে এটি দৃঢ় ও স্থায়ী কাঠামোর একটি উদাহরণ। এই শক্ত নির্মাণশৈলীর কারণেই মসজিদটি সাড়ে পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে।

‘খোজার মসজিদ’ নামটির উৎস নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। একটি প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুঘল আমলে বাংলার পাঠান বীর খাজা ওসমান খাঁ লোহানী এই অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন। ১৬১২ সালে মুঘল সেনাপতি শেখ কামালের বাহিনীর সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘর্ষের আগে তিনি এখানে ঘাঁটি গেড়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

স্থানীয়দের মতে, তিনি ও তার সৈন্যরা এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন এবং আশপাশের উঁচু টিলাটি সামরিক পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করতেন। ‘খাজা’ ওসমানের নাম থেকেই কালক্রমে ‘খোজার মসজিদ’ নামটি প্রচলিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এই সম্পর্কটি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়; বরং এটি স্থানীয় জনশ্রুতির অংশ।

মসজিদের উত্তর-পূর্ব দেয়ালে মাটি থেকে কিছুটা ওপরে বাঘের থাবার মতো গভীর কয়েকটি দাগ দেখা যায়। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, নির্মাণকালে একটি বাঘ এসে কাঁচা দেয়ালে থাবা বসিয়েছিল, যার চিহ্ন আজও রয়ে গেছে।

যদিও এ বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিশ্চিত নয়, কিছু গবেষকের মতে এটি সময়ের সঙ্গে সৃষ্ট ক্ষয় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে। তবুও এই চিহ্ন ঘিরে স্থানীয়দের আগ্রহ ও বিশ্বাস আজও অটুট।

মসজিদটি একটি মাঝারি উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত এবং এর উপরে একটি বড় গম্বুজ রয়েছে, যা সুলতানি স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করে। পশ্চিম দেয়ালে সংরক্ষিত কালো পাথরের শিলালিপিতে আরবি ও ফারসি ভাষায় সুলতানের প্রশস্তি ও নির্মাণকাল খোদাই করা আছে।

অতীতে মেহরাব ও বাইরের দেয়ালে পোড়ামাটির লতাপাতার অলঙ্করণ ছিল, যার কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। শিলালিপিটি বর্তমানে লোহার কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষিত, কারণ অতীতে এটি চুরির চেষ্টা হয়েছিল।

১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে মসজিদের গম্বুজ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ১৯৩৮-৪০ সালের দিকে আজম শাহ নামে এক আধ্যাত্মিক সাধক এখানে এসে আস্তানা গড়েন এবং মসজিদটির সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি বানিয়াচংয়ের দক্ষ রাজমিস্ত্রিদের এনে স্থানীয়ভাবে চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে গম্বুজ ও দেয়াল মেরামত করান। ১৯৬০ সালেও তিনি পুনরায় সংস্কার কাজ পরিচালনা করেন।

তার মৃত্যুর পর মসজিদটি আবার অবহেলায় পড়ে যায়। দীর্ঘদিন অযত্নে থাকার ফলে গম্বুজের ওপর বড় বড় গাছপালা জন্মায়, যা প্রাচীন গাঁথুনিকে দুর্বল করে তোলে।

১৯৮৪ সালের পর স্থানীয় মুসল্লিদের ব্যবহারের সুবিধার্থে মসজিদের পূর্ব পাশে একটি আধুনিক বারান্দা যুক্ত করা হয়। তবে এই সংস্কারকাজে প্রত্নতাত্ত্বিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সিমেন্ট ও টাইলস ব্যবহারের কারণে প্রাচীন পোড়ামাটির অলঙ্করণের একটি অংশ আড়াল হয়ে গেছে।

১৯৯৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাথমিক জরিপ করলেও এখনও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি।

উপসংহার

গয়ঘরের খোজার মসজিদ সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাস বহনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং ঐতিহাসিক, স্থাপত্যিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও মূল্যবান। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এটি দেশের একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র

১. সিলেটের ইতিহাস – সৈয়দ মুর্তজা আলী

২. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত – অচ্যুতচরণ চৌধুরী

৩. Social History of Bengal – আবদুল করিম

৪. বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার: মৌলভীবাজার

৫. প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদন – প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন