হামে ৯০২ শিশুর মৃত্যু: টিকা সংকটে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায় কোথায়?
এস এম মেহেদী হাসান
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু একটি সংখ্যা নয়। একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন থেমে যাওয়া, একজন মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়া, একজন বাবার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেঙে পড়া। আর যখন সেই মৃত্যু ঘটে এমন একটি রোগে, যা টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব, তখন সেই মৃত্যুর সঙ্গে ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতির দিকে তাকালে তাই উদ্বেগের পাশাপাশি একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে: একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ কীভাবে এত বড় প্রাণঘাতী সংকটে পরিণত হলো?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামসংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে পাঁচ মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ৯০২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হাম শনাক্ত হওয়ার পর এবং ৮০৩ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৭৬ জন। তাদের মধ্যে ১৭ হাজার ৮০০ জন হামে আক্রান্ত এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।
এই পরিসংখ্যান শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদনের সংখ্যা নয়। এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত শৈশব এবং একটি করে হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাদুর্ভাব এখনো পুরোপুরি থামেনি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ৭৯৮ শিশু এবং গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭০০ জন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে?
হাম এমন কোনো অজানা রোগ নয়। এটি টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগ। শিশুদের সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া গেলে হাম থেকে সুরক্ষা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব। তাহলে টিকা কার্যক্রমে কোথায় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল? কোথায় ছিল সরবরাহের সমস্যা? কেন কোনো কোনো এলাকায় শিশুরা নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
কারণ একটি দেশের টিকাদান কর্মসূচি একদিনে তৈরি হয় না। টিকার চাহিদা নির্ধারণ, ক্রয়, আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যন্ত এলাকার শিশুর হাতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের ব্যর্থতা হলে তার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
আর শিশুদের ক্ষেত্রে সেই ব্যর্থতার মূল্য কখনো কখনো দিতে হয় জীবন দিয়ে।
সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতির আলোচনায় টিকা ক্রয় ও সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে বলা হচ্ছে, টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের জবাবদিহি কোথায়?
এখানে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করার প্রশ্ন নেই। বরং প্রয়োজন নিরপেক্ষভাবে ঘটনা অনুসন্ধান করা।
কখন টিকার মজুত কমতে শুরু করেছিল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জানতে পেরেছিল? প্রয়োজনীয় ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করতে কত সময় লেগেছে? অর্থ বরাদ্দে কোনো সমস্যা ছিল কি না? আন্তর্জাতিক বাজারে টিকার সংকট ছিল কি না? থাকলে বিকল্প উৎস খোঁজা হয়েছিল কি না? মাঠপর্যায়ে টিকার ঘাটতির তথ্য কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, কোথায় ভুল হয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশে একটি অদ্ভুত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কোনো সরকারি ব্যবস্থাপনায় বড় ব্যর্থতা দেখা দিলে প্রথমে ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায় কার, সেই প্রশ্নটি অনেক সময় আড়ালে চলে যায়।
এটি চলতে পারে না।
শহরের একটি হাসপাতালের শিশুর মৃত্যু আমরা দেখতে পাই। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের সেই মা, যিনি দিনের পর দিন শিশুকে কোলে নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে টিকা না পেয়ে ফিরে এসেছেন, তাঁর গল্পটি কতটা আমাদের কাছে পৌঁছায়?
একজন দরিদ্র বাবা হয়তো জানতেন না, শিশুর কোন বয়সে কোন টিকা দেওয়ার কথা। স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যাওয়ার পর যদি তিনি জানতে পারেন টিকা নেই, তাহলে পরবর্তী তারিখে যাওয়ার সুযোগ তাঁর নাও থাকতে পারে। দিনমজুর মানুষটির এক দিনের কাজের মজুরি হারিয়ে আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
এভাবেই একটি ছোট প্রশাসনিক ঘাটতি ধীরে ধীরে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নেয়।
তাই টিকাদান শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কর্মসূচি নয়। এটি রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
এখন জরুরি হলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। যেসব শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করতে হবে। প্রত্যন্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ঢাকা ও সিলেটসহ যেসব এলাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি, সেখানে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে টিকা সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাটি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।
আজ যে টিকার ঘাটতি নিয়ে কথা হচ্ছে, কয়েক মাস পর যেন আবার অন্য কোনো টিকার ঘাটতি নিয়ে একই প্রশ্ন তুলতে না হয়।
স্বাস্থ্য খাতে কোনো সিদ্ধান্তের ভুলের প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে। সুতরাং টিকা ক্রয়, মজুত ও বিতরণে যদি কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি থেকে থাকে, তাহলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা নয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য বের করা।
যদি কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে থাকেন, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যদি নীতিগত সিদ্ধান্তে ভুল হয়ে থাকে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। আর যদি কোনো অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কারণ অন্ধকারে রেখে দেওয়া কোনো সংকটের সমাধান হয় না।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি শিশুর জীবনকে কখনোই সরকারি ফাইলের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা যাবে না।
আমরা উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা হয় তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিককে সে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে, সেখানে।
একজন দরিদ্র পরিবারের শিশুকে হাম থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্র যদি একটি টিকা সময়মতো দিতে না পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের হিসাব নতুন করে ভাবতে হয়।
আজ ৯০২টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য আমাদের সামনে। আগামীকাল এই সংখ্যা যেন আর না বাড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সরকারের কাছে তাই দাবি একটাই: হাম পরিস্থিতিকে শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে নয়, একটি জাতীয় মানবিক সংকট হিসেবে দেখতে হবে।
টিকা সরবরাহে কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে, কেন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি আর না হয়, তা খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের টিকাদান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
কারণ একটি শিশুকে বাঁচানোর সবচেয়ে সহজ সুযোগটি যদি টিকার মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাতে থাকে, সেই সুযোগ নষ্ট করার অধিকার কারও নেই।
আজ যে শিশুটি মারা গেল, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়। সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ছিল।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক