ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার: বিদ্যুৎ অপচয়, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
একসময় রিকশা ছিল বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের সবচেয়ে পরিচিত যানবাহনগুলোর একটি। রাজধানী হোক, জেলা শহর হোক কিংবা কোনো ছোট পৌরসভা, রিকশার গায়ে একটি নম্বর থাকত। সেই নম্বর দেখেই বোঝা যেত, এটি কোন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত রিকশা। কোথাও সিটি করপোরেশন, কোথাও পৌরসভা, কোথাও ইউনিয়ন পরিষদ নম্বর দিত। আবার কোনো কোনো এলাকায় রিকশা মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের নামেও নম্বর প্লেট দেখা যেত।
সেই নম্বর ব্যবস্থার সবকিছু যে আদর্শ ছিল, তা নয়। তবু অন্তত একটি পরিচয় ছিল। একটি রিকশা কোথা থেকে এসেছে, কার আওতায় চলছে, সেটি শনাক্ত করার একটি পথ ছিল।
সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যবর্তী সময় থেকে প্যাডেলচালিত রিকশার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার আরও চোখে পড়ার মতো হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কত রিকশা চলছে, কোথায় চলছে, কে নিয়ন্ত্রণ করছে, কীভাবে চার্জ হচ্ছে এবং প্রতিদিন কত বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর কি সরকারের কোনো দপ্তরের কাছে আছে?
যদি না থাকে, তাহলে শুধু চলাচলের অনুমতি বা নিষেধাজ্ঞার আলোচনা করে সমস্যার সমাধান হবে না।
ব্যাটারিচালিত রিকশার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বিদ্যুৎনির্ভর একটি পরিবহন ব্যবস্থা।
একটি সাধারণ ছোট ব্যাটারিচালিত রিকশায় সাধারণত ৩ বা ৪টি ব্যাটারি থাকে। এর দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৪ থেকে ৬ ইউনিট হতে পারে। বড় ইজিবাইক বা ভারী রিকশায় ৫ থেকে ৬টি ব্যাটারি থাকলে দৈনিক খরচ প্রায় ৮ থেকে ১২ ইউনিট পর্যন্ত হতে পারে।
অবশ্য প্রকৃত খরচ রিকশার ধরন, ব্যাটারির ক্ষমতা, চার্জের অবস্থা, চার্জারের দক্ষতা এবং ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। পুরোনো বা নিম্নমানের চার্জারে বিদ্যুৎ অপচয় বেশি হতে পারে। পুরোনো ব্যাটারিও একই পরিমাণ শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় চার্জ নিতে পারে।
এখন যদি দেশের মোট ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা জানা না থাকে, তাহলে তাদের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব কীভাবে হবে?
আর এই বিদ্যুৎ যদি নির্দিষ্ট কোনো চার্জিং স্টেশন থেকে না আসে, তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য আলাদা, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এখানে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে।
প্রথমত, যে বিদ্যুৎ সংযোগ বাসাবাড়ির জন্য নেওয়া, সেটি দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে কি না।
দ্বিতীয়ত, এভাবে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ হলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর এর মোট চাপ কত?
বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় যদি একদিকে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলা হয়, অন্যদিকে অন্য একটি খাতের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেখানে রাষ্ট্রের পরিকল্পনার প্রশ্ন উঠবেই।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই খাতে প্রতিদিন মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, তার একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব জনসমক্ষে নেই।
রিকশা বাড়ছে, কিন্তু বিদ্যুতের হিসাব কোথায়?
সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে এসব রিকশার চলাচল নিয়ে দ্রুত নীতিমালা করা হবে।
নীতিমালায় কোথায় এসব যান চলবে, কতটুকু চলবে, যানবাহনের মান ও কারিগরি সক্ষমতা কেমন হবে এবং চালকদের প্রশিক্ষণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেসব বিষয় নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশা একদিকে সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ করেছে, বিশেষ করে অল্প দূরত্বের যাতায়াতে। অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে প্রধান সড়কে ঢুকে পড়লে যানজট বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।
প্যাডেলচালিত রিকশার গতি তুলনামূলক কম। ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুতগতিতে চলতে পারে। কিন্তু চালকের দক্ষতা, যানটির ব্রেক, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও অন্যান্য কারিগরি নিরাপত্তা ঠিক না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
অদক্ষ চালক যখন যাত্রী নিয়ে দ্রুতগতিতে সড়কে চলেন, তখন ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয় যাত্রীকেই।
এখানে আরেকটি মানবিক দিকও মনে রাখা দরকার।
ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বড় একটি অংশ নিম্নআয়ের মানুষ। অনেকেই জীবিকার তাগিদে এই পেশায় এসেছেন। তাঁদের সামনে বিকল্প কর্মসংস্থান নেই। তাই শুধু ‘রিকশা বন্ধ’ বা ‘চালক উচ্ছেদ’ ধরনের সিদ্ধান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে না।
বরং প্রয়োজন নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, চালকের পরিচয়পত্র, নির্দিষ্ট রুট, নির্ধারিত গতি, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ।
যে চালক প্রশিক্ষণ নেননি, তাঁকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যে যান নিরাপদ নয়, সেটিকে সড়কে নামার অনুমতি দেওয়া যাবে না। যে এলাকায় যানটি চলার উপযোগী নয়, সেখানে চলাচলের সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নির্ধারণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এখানে পুরোনো একটি ব্যবস্থার কথা আবার মনে করা দরকার।
আগে রিকশার নম্বর ছিল। সেই নম্বর হয়তো সিটি করপোরেশন দিয়েছে, পৌরসভা দিয়েছে কিংবা স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন হলে সেই ধারণাকে আরও আধুনিক করা যায়।
প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার ডিজিটাল নিবন্ধন নম্বর থাকতে পারে। চালকের তথ্য, মালিকের তথ্য, গাড়ির ব্যাটারির ধরন, নির্ধারিত রুট এবং ফিটনেসের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে রাখা যেতে পারে।
তাহলে অন্তত জানা যাবে, দেশে কতটি রিকশা চলছে।
আজ যদি কেউ প্রশ্ন করেন, একটি শহরে কত ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে না পারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই লক্ষণ।
এই আলোচনায় বিদ্যুৎ বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাটারিচালিত যানবাহন অনুমোদন বা নিয়ন্ত্রণ শুধু সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
প্রতিদিন একটি রিকশায় যদি কয়েক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়, তাহলে হাজার হাজার রিকশা মিলে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার হিসাব থাকা দরকার। সেই বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে, কোন ধরনের সংযোগে চার্জ হচ্ছে এবং চার্জিংয়ের জন্য আলাদা অবকাঠামো প্রয়োজন কি না, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি।
ব্যাটারিচালিত যান অনুমোদন করার আগে এই হিসাব করাই ছিল স্বাভাবিক।
সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য দ্রুত নীতিমালা করার কথা বলেছে। এটি যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে।
নীতিমালায় অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার।
প্রথমত, প্রতিটি রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকের প্রশিক্ষণ ও পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট সড়ক ও এলাকায় চলাচলের অনুমতি দিতে হবে।
চতুর্থত, যানটির কারিগরি মান ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে।
পঞ্চমত, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি করতে হবে।
ষষ্ঠত, আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
সপ্তমত, সারাদেশে কত রিকশা চলছে এবং তারা কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার জাতীয় হিসাব তৈরি করতে হবে।
সবশেষে দরকার নিয়মিত তদারকি।
ব্যাটারিচালিত রিকশা দরিদ্র মানুষের চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এটিকে রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই।
কিন্তু কোনো যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে বলেই সেটিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া যায় না।
একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় দেখতে হয়: মানুষের জীবিকা, মানুষের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও সেই ভারসাম্য দরকার।
রিকশার চাকা ঘুরবে। মানুষ চলবে। চালকের জীবিকা চলবে। কিন্তু সেই চলাচল যেন যানজট, দুর্ঘটনা, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত নগর ব্যবস্থাপনার নতুন সংকট তৈরি না করে।
পুরোনো দিনের নম্বর প্লেটের সেই সহজ ধারণা থেকে আধুনিক ডিজিটাল নিবন্ধন পর্যন্ত যেতে হবে। প্রতিটি রিকশার পরিচয় থাকতে হবে, চালকের প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, চার্জিংয়ের বৈধ ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব থাকতে হবে।
কারণ রাস্তায় যে রিকশাটি চলছে, সেটি শুধু একটি যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের জীবিকা, একজন যাত্রীর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর একটি বাড়তি চাপ।
এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে না দেখলে কোনো নীতিমালাই পূর্ণাঙ্গ হবে না।