বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানি: দায় কার?
এস এম মেহেদী হাসান
বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা প্রথমে অন্ধকার দেখি। কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতরে যে মানুষের কতগুলো ছোট ছোট কষ্ট জমে থাকে, তার হিসাব কেউ রাখে না। শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়, অসুস্থ মানুষ গরমে কষ্ট পান, দোকানের ফ্রিজে থাকা পণ্য নষ্ট হয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় কমে যায়। শহরের বাসিন্দা বিকল্প হিসেবে আইপিএস বা জেনারেটর কিনতে পারেন, কিন্তু গ্রামের দরিদ্র পরিবারটির সেই সুযোগ কোথায়?
বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। অথচ বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ নেই, কোথাও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, কোথাও অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ, আবার কোথাও বৈধ সংযোগ নিতে গিয়ে নানা হয়রানির কথা শোনা যায়। এর পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ এবং বিদ্যুৎকর্মীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সব অভিযোগের সত্যতা একই নয়, কিন্তু এত অভিযোগ একসঙ্গে উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরব থাকার সুযোগ থাকে না।
প্রশ্নটি তাই শুধু বিদ্যুৎ আছে কি নেই, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাটি কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মানুষের জন্য কাজ করছে?
একজন সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু হয় মিটার থেকে। মাস শেষে বিল আসে। বিল দিতে হয়। সংযোগে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যেতে হয়। মিটার নষ্ট হলে অভিযোগ করতে হয়। নতুন সংযোগ চাইলে আবেদন করতে হয়। অর্থাৎ একজন নাগরিকের জীবনের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের সম্পর্ক সরাসরি।
কিন্তু এই সম্পর্ক যদি আস্থার বদলে ভয় ও হয়রানির হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের থাকে না, রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থার ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বৈধ সংযোগের জন্য নিয়ম মেনে আবেদন করেও নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আবার কোথাও অবৈধ সংযোগ বছরের পর বছর চলে। প্রশ্ন জাগে, বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কি এসব দেখেন না? যদি দেখেন, তাহলে ব্যবস্থা নেন না কেন? আর যদি না দেখেন, তাহলে মাঠপর্যায়ের তদারকি কোথায়?
অবৈধ সংযোগ কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। কোথাও বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, কোথাও অবৈধ লাইন টানা হচ্ছে, কোথাও মিটারে কারসাজির অভিযোগ উঠছে। এসব বন্ধ করার দায়িত্ব যাদের, তাদের চোখ এড়িয়ে এসব কীভাবে সম্ভব হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিদ্যুৎকর্মীদের সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত, এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেন। ঝড়-বৃষ্টি, রাতদিনের তোয়াক্কা না করে তাঁরা বিদ্যুৎ সচল করার চেষ্টা করেন। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্যুৎকর্মীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া, অবৈধ সংযোগে সহযোগিতা করা কিংবা কাজ করে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার যে অভিযোগ বিভিন্ন জায়গায় শোনা যায়, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
একজন মানুষ যখন বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মীর কাছে সমস্যার সমাধান চান, তখন তিনি সেবা পাওয়ার অধিকার নিয়ে যান। সেখানে যদি তাকে বলা হয়, ‘এটা করতে হলে এত টাকা লাগবে’, তাহলে সেটি শুধু ঘুষের অভিযোগ নয়, একজন নাগরিকের মর্যাদার ওপরও আঘাত।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এ ধরনের অনিয়ম যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে মানুষও একসময় ভাবতে শুরু করে, টাকা না দিলে কাজ হবে না। তখন দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম থাকে না, নিয়মে পরিণত হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শুধু অফিসে বসে ফাইল দেখা নয়। তাঁদের নিয়মিত মাঠে যেতে হবে। কোথায় অবৈধ সংযোগ রয়েছে, কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ লাইন, কোথায় মিটার নিয়ে অভিযোগ, কোথায় দীর্ঘদিন সমস্যা হচ্ছে, তা জানতে হবে।
বিশেষ করে একটি এলাকায় অবৈধ সংযোগ থাকলে শুধু সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। কারা সংযোগ দিল, কীভাবে দেওয়া হলো, দীর্ঘদিন কেন চলল, সংশ্লিষ্ট কর্মী বা কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও খুঁজে দেখা দরকার।
কারণ অবৈধ সংযোগের পেছনে যদি কোনো সুবিধাভোগী চক্র থাকে, তাহলে শুধু গ্রাহককে দোষী বানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও দায়মুক্ত করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ উঠলেই যদি তা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকে, তাহলে মানুষের আস্থা ফিরবে কীভাবে?
বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষ কিছু সময় অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ মনে করে, তার অভিযোগ কেউ শুনছে না, তখন তৈরি হয় অন্যরকম অন্ধকার।
ধরা যাক, একজন গ্রাহক ভুল বিলের অভিযোগ করলেন। তিনি অফিসে গেলেন। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরলেন। সমস্যার সমাধান হলো না। আবার গেলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘দেখছি।’ মাস শেষে আবার একই সমস্যা। এভাবে একজন মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে যান।
একইভাবে, কোনো গ্রামের মানুষ যদি দিনের পর দিন অবৈধ সংযোগ দেখে এবং নিয়মিত বিল দেওয়া গ্রাহক হয়েও বিদ্যুৎ সমস্যায় ভোগেন, তাঁর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে, নিয়ম মেনে চলার লাভ কী?
রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম তুলে ধরতে সাংবাদিকতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন আগের মতো শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে মফস্বলে একজন সাংবাদিককে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। তথ্য পাওয়া কঠিন, প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকে, বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক থাকে, আবার মামলা-মোকদ্দমার ভয়ও থাকে।
ঢাকার সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি কম নয়। যে বিষয়ে অনুসন্ধান করলে শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হতে পারে, সেখানে অনেকেই স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক থাকেন।
কিন্তু এই ভয় যদি সত্য প্রকাশের পথে স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ বিভাগের অনিয়ম, অবৈধ সংযোগ বা গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ নিয়ে নিয়মিত অনুসন্ধান হওয়া দরকার। কোথায় কত বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত, কত টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র, এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের সব সমস্যা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া যায়।
প্রথমত, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে এবং এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মী জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের অভিযোগের জন্য কার্যকর ও সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করার পর তার অগ্রগতি অনলাইনে বা মোবাইলের মাধ্যমে জানা গেলে হয়রানি অনেক কমবে।
তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একটি এলাকায় দীর্ঘদিন অবৈধ সংযোগ চললে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অন্তত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
চতুর্থত, বিদ্যুৎকর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ বা অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে আলাদা নজরদারি দরকার। শুধু গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া কর্মীকেই নয়, তাকে প্রশ্রয় দেওয়া বা আড়াল করা ব্যক্তিকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সবশেষে দরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ সংযোগের জন্য চাপ দিলে কর্মকর্তাকে যেন বলতে পারেন, ‘আইন অনুযায়ী এটি সম্ভব নয়।’ কারণ একজন কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত রাষ্ট্রের আইন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি মনে রাখেন, তাঁরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন, তাঁরা জনগণের সেবক, তাহলে অনেক পরিবর্তন সম্ভব।
একটি বাতি জ্বালানো খুব ছোট কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই আলোয় একজন শিশু পড়াশোনা করে, একজন মা রান্না করেন, একজন রোগী চিকিৎসা নেন, একজন দোকানি তাঁর ব্যবসা চালান। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।
আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো নতুন তার, নতুন ট্রান্সফরমার কিংবা নতুন মিটার নয়। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সততা, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহি।
কারণ রাষ্ট্র যখন নাগরিকের কাছ থেকে নিয়মিত বিল নেয়, তখন নাগরিকেরও অধিকার আছে নিয়মিত ও ন্যায্য সেবা পাওয়ার। সেই অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আর সেই দায়িত্ব পালনের পথে যদি কেউ অবৈধ সংযোগের বিনিময়ে নিজের পকেট ভারী করেন, গ্রাহককে হয়রানি করেন কিংবা অনিয়ম দেখেও চোখ বন্ধ রাখেন, তাহলে তাঁকে মনে রাখতে হবে, অন্ধকার শুধু একটি ঘরকে ঢেকে রাখে না। কখনো কখনো সেই অন্ধকার পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাসকেও ঢেকে ফেলে।
এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক