বাংলার সহাবস্থানের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বিশ্লেষণ
বাংলার দাওয়ায় শঙ্খও বাজে, আজানও হয়: এই সুর যে দল কাটবে তার পতন অবশ্যম্ভাবী
লুতুব আলি, পশ্চিমবঙ্গ, ২১ এপ্রিল — পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বোঝার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তার দাওয়ায়। এই দাওয়া ইট-সিমেন্টের নয়, সংস্কৃতির। এখানে ভোর হয় উলুধ্বনি আর আজানে, সন্ধ্যা নামে শাঁখের শব্দে আর মাগরিবের ডাকে। দুর্গাপুজোর ঢাকের বোল মিশে যায় মহরমের তাজিয়ার সঙ্গে, দোলের আবির উড়ে পড়ে ঈদের সিমুইয়ের প্লেটে। এই সহাবস্থান কোনো সরকারি প্রকল্প নয়, হাজার বছরের অভ্যাস। তাই বাংলার ভোটার ব্যালটে ছাপ দেওয়ার আগে দেখে নেয়, কোন দল এই সুর অক্ষত রাখতে চায়, আর কে তাতে ছেদ ঘটাতে চায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস — দুই প্রধান প্রতিপক্ষের দর্শন মাপতে হবে এই দাওয়ার মানদণ্ডেই। মাদক ও জুয়া বন্ধে কড়া বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর | পাল্টা প্রশ্ন সাংবাদিকের
১. দাওয়ার ইতিহাস: বাংলার রাজনৈতিক ব্যাকরণ
বাংলার সমাজ-মন তৈরি হয়েছে শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্ম, লালন-হাসনের মরমি গান, রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’, নজরুলের ‘সাম্যের গান’, আর নেতাজির ‘সকলকে নিয়ে চলা’ মন্ত্রে। এখানে ধর্ম ব্যক্তিগত, উৎসব সর্বজনীন। পাড়ার কালীমন্দির কমিটিতে রহিম চাচা চাঁদা তোলেন, ঈদের জামাত শেষে ইমাম সাহেব পুজো মণ্ডপে চা খেতে আসেন। এই চিত্র নাটক নয়, নিত্যদিন। ফলে যখনই রাজনীতি ‘আমরা-ওরা’ রেখা টানে, বাঙালি ভোটার সতর্ক হয়। ১৯৪৬-এর দাঙ্গা, ১৯৬৪-এর উত্তেজনা, ১৯৯২-পরবর্তী টানাপোড়েন — প্রতিবারই শেষে জিতেছে এই সহাবস্থানের সংস্কৃতি। কারণ দাঙ্গা লাগলে পোড়ে দোকান, বন্ধ হয় কারখানা, খালি হয় ভাতের হাঁড়ি। বাংলার ভোটার তাই দাঙ্গাকে ‘লোকসান’ হিসেবে দেখে, ‘লাভ’ হিসেবে নয়।
২. তৃণমূল কংগ্রেসের দর্শন: ‘সবাইকে নিয়ে বাংলা’
২০১১ সালে পরিবর্তনের পর তৃণমূল কংগ্রেস তার রাজনীতিকে দাঁড় করিয়েছে ‘বাঙালি-অস্মিতা’ ও ‘সর্বজনীন সুবিধা’ — এই দুই খুঁটির উপর। ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগান ভূমিপুত্রের আবেগ ছুঁয়েছে, আর ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ বহিরাগত-বিতর্ককে ভোটের অস্ত্র করেছে। শাসন-কাঠামোয় এই দর্শন নেমেছে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ডের মতো প্রকল্পে। লক্ষণীয়, এসব প্রকল্পের উপভোক্তা হিন্দু-মুসলিম-আদিবাসী-খ্রিস্টান সবাই। ফলে ‘তোষণ’ বিতর্ক তুলে সুবিধা হয়নি, কারণ মাঠ বলছে ‘টাকা ঢুকছে সবার ঘরে’। মাদ্রাসা বন্ধের দাবি ঘিরে তর্ক-বিতর্ক | পাল্টা জবাবে সাংবাদিক মেহেদী হাসান
ধর্মীয় প্রশ্নে তৃণমূল ‘উৎসব-সমতা’ নীতি নিয়েছে। দুর্গাপুজোয় ক্লাব-অনুদান দিলে ঈদে ইমাম-মোয়াজ্জিন ভাতা দিয়েছে, রেড রোডে ঈদের নমাজে মুখ্যমন্ত্রী হাজির থেকেছেন, আবার গঙ্গাসাগর মেলায় নিজে নেমে পুণ্যার্থী সামলেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগ, হজ হাউস সংস্কার, উর্দু অ্যাকাডেমির পাশাপাশি জগন্নাথ ধাম, দক্ষিণেশ্বর স্কাইওয়াক, কালীঘাট সংস্কার — দুই দিকেই বিনিয়োগ করেছে। বার্তাটি স্পষ্ট: ‘শাঁখও বাজবে, আজানও হবে’। এই অবস্থান সংখ্যাগুরুকে ‘আমার ধর্ম নিরাপদ’ বোধ দিয়েছে, সংখ্যালঘুকে দিয়েছে ‘আমিও নিরাপদ’ বোধ। ফলে সামাজিক স্থিতির প্রতীক হিসেবে তৃণমূল ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
তবে দুর্বলতাও আছে। স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, নিয়োগ-বিভ্রাট ও ১০০ দিনের টাকা আটকে যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। তৃণমূল তা সামলাতে ‘দুয়ারে সরকার’ ও সরাসরি নগদ হস্তান্তরে জোর দিয়েছে, যাতে ‘বেনিফিশিয়ারি’ পরিচিতি ধর্মের আগে আসে।
৩. বিজেপির দর্শন: ‘হিন্দুত্ব ও বিকাশ’ — কিন্তু সুর কাটছে কোথায়
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এসেছে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ ও ‘আসল পরিবর্তন’ স্লোগান নিয়ে। অর্থনৈতিক ইস্যুতে শিল্প, কর্মসংস্থান, হলদিয়া-দুর্গাপুর করিডর, চা-বাগানে ন্যূনতম মজুরি — এসব প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু প্রচারের মুখ্য স্বর হয়ে উঠেছে ‘অনুপ্রবেশ’, ‘তোষণ’, ‘লাভ জিহাদ’, ‘জয় শ্রীরাম’। এই শব্দগুলো উত্তর ও পশ্চিম ভারতের ভোট-বাক্সে কাজ করলেও বাংলার দাওয়ায় তা বেসুরো শোনায়। কারণ বাঙালি হিন্দু ভোটারের বড় অংশ নিজেকে ‘সাংস্কৃতিক হিন্দু’ ভাবে, ‘রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী’ নয়। তার কাছে সরস্বতী পুজো যেমন আবেগ, পাশের বাড়ির সালাম ভাইয়ের ঈদের দাওয়াতও তেমনই স্বাভাবিক। ফলে ‘ওরা-আমরা’ বিভাজন এলে সে ভাবে, ‘আমার পাড়া ভাঙবে’।
দ্বিতীয়ত, ‘বহিরাগত’ তকমা। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের ভাষা, ভঙ্গি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অতিসক্রিয়তাকে তৃণমূল ‘বাংলা-বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করেছে। ‘গুজরাট মডেল’ বা ‘ইউপি মডেল’ চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরেছে। বাঙালি আত্মমর্যাদা প্রশ্নে স্পর্শকাতর। ফলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও যখন ‘বহিরাগত’ মোড়কে আসে, ভোটার সরে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু নীতি। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’ দলীয় স্লোগান হলেও, মাঠের প্রচারে মসজিদ-মাদ্রাসা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য, নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ধোঁয়াশা, এবং রাজ্য ইউনিটের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলের পোস্ট — এই তিন মিলে ‘আশঙ্কা’ তৈরি করেছে। ফলে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের ৯০ শতাংশই বিজেপি-বিরোধী শিবিরে থেকে যাচ্ছে। আবার হিন্দু ভোটেরও শিক্ষিত-শহুরে-মধ্যবিত্ত অংশ ভাবছে, ‘ধর্ম নিয়ে বেশি টানাটানি হলে ব্যবসা-চাকরি মার খাবে’।
৪. দাওয়ার সুর কাটলে পতন কেন অবশ্যম্ভাবী
বাংলার নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, যে দলই সহাবস্থানের সুতো কাটতে গেছে, ভোটার তাকে কেটে দিয়েছে। ১৯৭৭-পূর্ব কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, সত্তর দশকের সন্ত্রাস, ২০১১-পূর্ব বামের ‘পার্টি-সর্বস্ব’ ইমেজ — সবই পতনের কারণ। কারণ এগুলো ‘দাওয়ার সুর’ নষ্ট করেছিল। বর্তমান প্রেক্ষিতে বিজেপি যদি শুধু ধর্মীয় মেরুকরণের উপর ভরসা করে, তাহলে সে একই ভুল করবে। ২০২১-এ ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েও ৭৭ আসনে থেমে যাওয়া তার প্রমাণ। ২০২৪-এ আসন আরও কমে ১২। কারণ ভোট-বণ্টন ছড়িয়ে আছে, কিন্তু কেন্দ্রীভূত নয়। হিন্দু ভোটও একমুখী নয়। মতুয়া, রাজবংশী, কুড়মি, আদিবাসী — প্রত্যেকের নিজস্ব দাবি আছে। ‘হিন্দু’ ছাতার তলায় সবাইকে আনা যায়নি।
অন্যদিকে তৃণমূল যদি ‘উৎসব-সমতা’ থেকে সরে গিয়ে একপেশে হয়, তারও পতন হবে। ইতিমধ্যে নিয়োগ-দুর্নীতি, পঞ্চায়েত-হিংসা, ও প্রশাসনিক একদেশদর্শিতা নিয়ে শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশ বিরক্ত। সেই ক্ষোভ যদি বিজেপি ‘বিকাশ’ ও ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’ দিয়ে ধরতে পারে, তাহলে খেলা ঘুরবে। কিন্তু শর্ত একটাই — ‘শাঁখ-আজান’ দুটোকেই সম্মান দিতে হবে।
৫. ২০২৬-এর দিকনির্দেশ: কার কী করণীয়
বিজেপির সামনে পথ স্পষ্ট। এক, ‘হিন্দুত্ব’ শব্দের বদলে ‘বাঙালিত্ব’ সামনে আনতে হবে। রবীন্দ্র-নজরুল-নেতাজি-শ্রীচৈতন্য — এই চার স্তম্ভে প্রচার দাঁড় করাতে হবে। দুই, অর্থনীতিকে মুখ্য করতে হবে। ১০ লক্ষ চাকরি, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল হাব, চর্ম-জরি-তাঁত শিল্পে জিএসটি ছাড়, মাদ্রাসা-পড়ুয়াদের জন্য NEET কোচিং — সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। তিন, সংখ্যালঘু কারিগর-ব্যবসায়ীদের কাছে যেতে হবে টুপি-দাড়ি নিয়ে ব্যঙ্গ নয়, বাজার-ঋণ-রফতানির প্রস্তাব নিয়ে। চার, প্রার্থী বাছাইয়ে ‘গ্রহণযোগ্য মুখ’ আনতে হবে, যাঁরা পাড়ার দুর্গাপুজোতেও থাকেন, ঈদের দাওয়াতেও যান।
তৃণমূলের সামনে চ্যালেঞ্জ ‘সুবিধা’ থেকে ‘অধিকার’-এ উত্তরণ। ভাতা-নির্ভরতা কমিয়ে স্কিল, স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র শিল্পে জোর দিতে হবে। নিয়োগে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু দু’পক্ষের কাছেই ‘পক্ষপাতহীন প্রশাসক’ ইমেজ পোক্ত করতে হবে। কারণ ‘দাওয়ার সুর’ কাটে দুর্নীতিতেও, শুধু দাঙ্গায় নয়।
৬. শেষ কথা
বাংলার দাওয়া ভাঙা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। যে দল শাঁখের শব্দকে আজানের ধ্বনির প্রতিপক্ষ করবে, সে দাওয়া থেকে পড়ে যাবে। যে দল আজানকে শাঁখের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে, তারও একই দশা হবে। ভোটার দেখছে, কে দুটো শব্দকে একসুরে বাজাতে চায়। ২০২৬-এ ব্যালট সেই সুরের পক্ষেই বাজবে। কারণ দিনের শেষে দোকান খুলতে হয়, ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে হয়, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে হয়। এই নিশ্চয়তা যার হাতে, দাওয়া তার।