শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

খালের মাটি দিয়ে ইট: কৃষিজমির টপ সয়েল বাঁচানোর উদ্যোগে নজরদারিই বড় পরীক্ষা

৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • Editing Section
৬৪৪ বার দেখা
শেয়ার করুন

লেখক: এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

বাংলাদেশে মাটি শুধু মাটি নয়। এই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের বড় একটি অংশ। অথচ ইট তৈরির জন্য বছরের পর বছর কৃষিজমির ওপরের উর্বর মাটি তুলে নেওয়া হচ্ছে। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে যে জমি আছে তার উৎপাদনক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় খালের খনন থেকে পাওয়া মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করার সরকারি উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে অন্তত একটি বিকল্প উৎস তৈরি হতে পারে। কৃষিজমির টপ সয়েলের ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে খাল খননের পর যে বিপুল পরিমাণ মাটি পড়ে থাকে, সেটিরও একটি ব্যবহার নিশ্চিত হতে পারে।

তবে উদ্যোগটি ভালো বলেই কাজটি সহজ হবে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বরং এর সফলতা নির্ভর করবে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, সরবরাহের স্বচ্ছতা, মূল্য নির্ধারণ এবং সবচেয়ে বড় কথা, নজরদারির ওপর।

কৃষিজমির মাটি দিয়ে ইট বানানোর ক্ষতি কোথায়?

দেশে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব ইটভাটায় প্রতিবছর প্রায় ৬ কোটি ঘনমিটার টপ সয়েল ব্যবহার হচ্ছে।

একবার ভাবুন, যে মাটি দিয়ে কৃষক ধান, গম, সবজি কিংবা অন্যান্য ফসল ফলান, সেই জমির ওপরের উর্বর স্তর কেটে নিয়ে ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে। ইট তৈরি হয়ে হয়তো একটি ভবন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কতটা কঠিন, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।

মাটির ওপরের স্তরেই সাধারণত কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই শুধু জমির পরিমাণ কমে যাওয়াই সমস্যা নয়। জমির উর্বর অংশ সরিয়ে ফেলাও কৃষির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ প্রতিবছর ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারাচ্ছে। গবেষণাটির তথ্য পুরোনো হলেও এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে রাস্তাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও নগরায়ণকে কৃষিজমি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন এর সঙ্গে যদি ইটভাটার জন্য মাটি কাটার চাপও যোগ হয়, তাহলে কৃষিজমি রক্ষার লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খালের মাটি ব্যবহারের সুযোগ

সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম ধাপে তিনটি মন্ত্রণালয়ের চারটি সংস্থা ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করবে।

এত বড় কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ মাটি উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই মাটি যদি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একদিকে খাল খননের সুফল পাওয়া যাবে, অন্যদিকে ইটভাটার জন্য কৃষিজমির মাটির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুরকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক উদ্যোগের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ইটভাটার সংখ্যা এবং খননের জন্য চূড়ান্ত করা খালের দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে এসব জেলা নির্বাচন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এটি বাস্তবভিত্তিক একটি পদ্ধতি হতে পারে। আগে কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষা, তারপর ফলাফল দেখে সারাদেশে সম্প্রসারণ। বড় কোনো নীতিকে একবারে সারাদেশে প্রয়োগের চেয়ে এই পদ্ধতি অনেক বেশি নিরাপদ।

তবে খালের সব মাটি কি ইট তৈরির উপযোগী?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

খাল থেকে মাটি উঠলেই সেটি ইট তৈরির জন্য উপযুক্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মাটির ধরন, গঠন, আর্দ্রতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হবে। সরকারও বলছে, প্রথমে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হবে। খননের পর মাটি ভেজা থাকবে, শুকানোর পর পরীক্ষা করা হবে। ফল সন্তোষজনক হলে ইটভাটায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই পরীক্ষার বিষয়টি কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিকতা হওয়া উচিত নয়।

কারণ শুধু ইটভাটার মালিকেরা সন্তুষ্ট হলেই মাটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। মাটি আসলে ইট তৈরির জন্য উপযোগী কি না, তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, সব খালের মাটি কি একই রকম হবে? নিশ্চয়ই নয়। ফলে জেলা বা অঞ্চলভিত্তিক মাটির মান যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।

খালের মাটি যেন নতুন ব্যবসার সুযোগ না হয়ে যায়

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে এখানেই।

সরকার খাল খনন করবে। মাটি উঠবে। সেই মাটি ইটভাটায় যাবে। এরপর যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে ভালো একটি উদ্যোগও নতুন ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কার মাটি কত দামে দেওয়া হবে?

কোন ইটভাটা কত মাটি পাবে?

ইজারা কীভাবে হবে?

মাটি পরিবহনের খরচ কে বহন করবে?

সব ইটভাটা কি সমান সুযোগ পাবে?

এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর দরকার।

মাটি সরবরাহের ক্ষেত্রে যদি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা পায়, তাহলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। বরং পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য নীতিমালার আওতায় আনা দরকার। কোথা থেকে কত মাটি উঠল, কত মাটি ব্যবহারযোগ্য, কত মাটি কোন প্রতিষ্ঠান নিল, কী দামে নিল, এসব তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

স্বচ্ছতা থাকলে সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।

মাটি কাটার আরেকটি জায়গা বন্ধ করতে হবে

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, শীতকালে অনেক নদী অনেক দূর পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। সেখান থেকে মাটি নেওয়া গেলে ড্রেজিংয়ের খরচও কমতে পারে। পাশাপাশি কৃষিজমি ও পাহাড় কাটা বন্ধে সহায়তা হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

এখানে একটি ভারসাম্য দরকার।

নদী বা খাল থেকে মাটি নেওয়া যাবে বলেই যেখানে-সেখানে মাটি কেটে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরের স্থিতিশীলতা, পরিবেশ এবং নৌপথের ওপর এর প্রভাবও দেখতে হবে।

অর্থাৎ কৃষিজমির মাটি বাঁচাতে গিয়ে নদী-খালের পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত: ব্লক ইট

এই উদ্যোগের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। মাটি পুড়িয়ে প্রচলিত ইট তৈরির পদ্ধতি থেকে বের হয়ে পাথর, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট তৈরি এবং সরকারি প্রকল্পে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে মাটির ওপর চাপ আরও কমতে পারে।

কারণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু ইটভাটার জন্য বিকল্প মাটি খুঁজে বের করা নয়। একই সঙ্গে আমাদের নির্মাণব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে এমন দিকে নিতে হবে, যেখানে কৃষিজমির মাটি পোড়ানোর প্রয়োজন কমে আসে।

সরকারি প্রকল্পগুলো এখানে বড় উদাহরণ তৈরি করতে পারে। সরকার নিজেই যদি ব্লক ইট ব্যবহার বাড়ায়, তাহলে বেসরকারি নির্মাণ খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইটভাটা মালিকদের কথাও শুনতে হবে

ইটভাটা মালিকদের জন্য মাটি একটি অপরিহার্য উপাদান। চট্টগ্রাম ইটভাটা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এখন কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করতে না পেরে পুকুর ও ডোবার মাটি ব্যবহার করছেন। কম দামে সরকার মাটি সরবরাহ করলে তারা আগ্রহী হবেন বলেও জানিয়েছেন।

এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যাবে না।

শুধু আইন করে কৃষিজমির মাটি বন্ধ করে দিলে হবে না। বিকল্প উৎসকে সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য করতে হবে। নইলে অবৈধভাবে মাটি সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তাই সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ পাশাপাশি। একদিকে কৃষিজমির টপ সয়েল রক্ষা করা, অন্যদিকে ইটভাটার জন্য বৈধ বিকল্প তৈরি করা।

ভালো উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নে

খালের মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করার উদ্যোগটি তাই সম্ভাবনাময়। এতে একই সঙ্গে কয়েকটি সমস্যার সমাধানের সুযোগ আছে। খাল খননের পর পড়ে থাকা মাটির ব্যবহার হতে পারে, ইটভাটায় কৃষিজমির টপ সয়েলের ব্যবহার কমতে পারে এবং মাটি সংগ্রহের জন্য কৃষিজমি, পাহাড় কিংবা অন্য উৎসের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না।

মাটির মান পরীক্ষা হতে হবে নিরপেক্ষভাবে। ইজারা ও সরবরাহ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ। মাটির দাম এমন হতে হবে, যাতে ইটভাটার মালিকেরা বৈধ উৎস ব্যবহারে উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে কৃষিজমি কাটা হচ্ছে কি না, সেটিও কঠোরভাবে দেখতে হবে।

সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি ইট তৈরি করতে কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না, কিন্তু একটি জমির উর্বরতা তৈরি হতে অনেক বছর লাগে।

উন্নয়ন আমাদের দরকার। ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, শিল্পকারখানাও দরকার। কিন্তু উন্নয়নের জন্য যদি কৃষির ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ফেলি, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য একদিন আমাদেরই দিতে হবে।

তাই খালের মাটি দিয়ে ইট তৈরির উদ্যোগ শুধু ইটভাটার জন্য বিকল্প মাটি খোঁজার প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে কৃষিজমি রক্ষা, নির্মাণ খাতের পরিবর্তন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি বৃহত্তর উদ্যোগ হিসেবে।

ভালো পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা আর কঠোর নজরদারি থাকলে এই উদ্যোগ সত্যিই কৃষিজমির মাটি বাঁচানোর একটি কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন