শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: ভারতের সঙ্গে মর্যাদার সম্পর্ক ও মার্কিন উড়োজাহাজ কেনার নতুন সমীকরণ

১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • Editing Section
৭৩৬ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, ইতিহাস, বাণিজ্য, সীমান্ত, নদীর পানি, নিরাপত্তা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের কারণে ভারতকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু প্রতিবেশী মানেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা নির্ভরতা থাকবে, এমনটিও নয়। একটি স্বাধীন দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ।

সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে, তবে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি। উপযুক্ত পরিবেশ ও সময়ে সফর হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বক্তাদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাকে তিনি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখেছেন।

এই বক্তব্যগুলো শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। বরং এর ভেতরে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব কি সমতার ভিত্তিতে হবে?

প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, তবে আত্মমর্যাদার জায়গা থেকে

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, বহু বিষয়েই দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু একটি সম্পর্ক তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থের প্রতি সম্মান থাকে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই বার্তাটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। উপযুক্ত সময়, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সফরের সময় নির্ধারণ করা হবে।

এখানে তাড়াহুড়োর চেয়ে নীতির বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে শুধু সফর করলেই হয় না। সেই সফর থেকে দেশের মানুষ কী পেল, কী আলোচনা হলো, কোন সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হলো, সেটিও দেখতে হয়।

দিল্লি সফর তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর না হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার একটি সুযোগ হওয়া উচিত।

রাজনীতির ছায়া যেন রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে গ্রাস না করে

দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বক্তাদের নিয়ে একটি আলোচনা সভার অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাকে সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক এক বিষয় নয়। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে, কিন্তু দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক থেকে যায়।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান, যেখানে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইরের কোনো পক্ষের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না। একই নীতি ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ যেমন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না, ভারতও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে একই সংযম দেখাবে, সেটিই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

‘সন্ত্রাসীর নিরাপদ আশ্রয়’ কোনো দেশের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। ভারত থেকে পালিয়ে আসা কোনো সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেবে না। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো সন্ত্রাসী যেন ভারতেও আশ্রয় না পায়, সেটিও বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

এখানে নীতিটি খুব পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সন্ত্রাসী বা অপরাধীর পরিচয় রাজনৈতিক রঙে বিচার করা উচিত নয়। অপরাধী যে দেশেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আড়ালে নিরাপদ জায়গা করে দেওয়া দুই দেশের নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই বিষয়টি তাই গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

মার্কিন উড়োজাহাজ কেনা: চাপ নয়, প্রয়োজনের প্রশ্ন

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গ।

তিনি বলেছেন, কোনো চাপের কারণে নয়, এভিয়েশন খাতের প্রয়োজন বিবেচনা করেই উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি এগোচ্ছে। বাংলাদেশের বিমান বহরের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে নতুন রুট চালু করা সম্ভব হবে না এবং ব্যবসার সুযোগও হারাতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

এটি শুধু উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যটন, প্রবাসী যাত্রী, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে বলে যে চাহিদার কথা বলা হয়েছে, সেটিও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। উড়োজাহাজ কেনা মানেই শুধু উড়োজাহাজের দাম পরিশোধ করা নয়। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, জ্বালানি ব্যয়, পরিচালন দক্ষতা এবং যাত্রীসংখ্যা, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

তাই বিমান কেনার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন না বানিয়ে ব্যবসায়িক ও জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

ওয়াশিংটন-বেইজিং-দিল্লি: ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের শক্তি

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, আবার চীনের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বৈদেশিক সম্পর্কে একটি ভারসাম্য বজায় রেখে সরকার এগোচ্ছে।

এই ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভারত, চীন এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এই বাস্তবতায় কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুবিধাজনক নাও হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনা হলে সেটি যেন কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হয়। ভারতের সঙ্গে আলোচনা হলে সেটিও যেন পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্কও একইভাবে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে পরিচালিত হওয়া দরকার।

আমাদের কূটনীতির মূল কথা হওয়া উচিত বাংলাদেশ

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশকে নিয়ে।

বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে যেতে চায় না। আবার কারও ওপর নির্ভরশীল হয়েও থাকতে চায় না। এই দুইয়ের মাঝখানে যে পথ, সেটিই বাস্তবসম্মত কূটনীতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে তাই বড় দায়িত্ব। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে, আবার জাতীয় স্বার্থের জায়গায় কোনো ছাড় না দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের মানুষ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চায়, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু মাথা নত করার সংস্কৃতি থাকবে না।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে সমতা ও পারস্পরিক সম্মান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে, কিন্তু তা হবে বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনায়। চীনের সঙ্গেও সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নয়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতাও একটি রাষ্ট্রের বড় শক্তি।

বাংলাদেশের আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সেখানেই। বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের স্বার্থে। এ নীতিই যদি বাস্তবে ধরে রাখা যায়, তাহলে পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির মধ্যেও বাংলাদেশ নিজের জন্য একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন