দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের শক্তি কোথায়: নেপালের সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা
এস এম মেহেদী হাসান
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝে না, সীমান্ত মানে না, ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল চেনে না। বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড় যখন আঘাত হানে, তখন রাষ্ট্রের সামনে একটাই বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়: মানুষকে কত দ্রুত নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়?
সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিভিন্ন এলাকা বিপর্যস্ত হওয়ার পর দেশটির সরকার বিদেশি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর আগ্রহের বিপরীতে নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন, এটি নেপালের আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রকাশ। আবার কেউ মনে করছেন, দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন বাঁচানোই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
আমার কাছে বিষয়টি শুধু নেপালের একটি সিদ্ধান্ত নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে।
একটি স্বাধীন দেশের প্রথম দায়িত্ব হলো নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সক্ষমতা তৈরি করা। দুর্যোগ এলেই অন্য দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, এমন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে কাম্য নয়।
নেপালের সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ ও স্থানীয় উদ্ধারকারী বাহিনীর পাহাড়ি অঞ্চলে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ভূমিধসপ্রবণ এলাকা, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন এবং ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে তাদের বাস্তব জ্ঞান আছে। ফলে নিজেদের বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা নেপাল সরকারের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বরং প্রতিটি দেশেরই উচিত দুর্যোগ মোকাবিলায় এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে প্রথম ধাক্কাটি নিজেরাই সামাল দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা এবং প্রয়োজনের সময় অন্যের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা কি একই বিষয়?
আমার মনে হয়, অবশ্যই নয়।
দুর্যোগের সময় একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের জীবন।
ধরা যাক, কোনো পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি পরিবার ভূমিধসের নিচে আটকা পড়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম নেই। অন্যদিকে কোনো বিদেশি উদ্ধারকারী দলের কাছে এমন যন্ত্র আছে, যার মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষ শনাক্ত করা সম্ভব।
এ অবস্থায় শুধু জাতীয় মর্যাদার কথা বলে সেই সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা কি ঠিক হবে?
রাষ্ট্রের মর্যাদা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্বও অমূল্য। কিন্তু সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্বই তো হলো নিজের মানুষের জীবন রক্ষা করা।
একজন মানুষকে বাঁচানোর সুযোগ যদি কোনো সহযোগিতার মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে সেই সহযোগিতা গ্রহণ করাকে দুর্বলতা বলা যায় না। বরং প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই বিচক্ষণ নেতৃত্বের পরিচয়।
নেপালের ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকারী ও ত্রাণকর্মী নেপালে গিয়েছিলেন। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক দল ও ত্রাণবাহী বিমান একসঙ্গে পৌঁছানোর ফলে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছিল।
দুর্যোগের সময় শুধু সাহায্য পাওয়াই যথেষ্ট নয়। সেই সাহায্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতাও প্রয়োজন।
একটি দেশের প্রশাসন যদি বিদেশি দলগুলোর নিরাপত্তা, থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত, যোগাযোগ, বিমান চলাচল এবং স্থানীয় উদ্ধারকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে নিজের মূল কাজেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সহায়তাই কখনো কখনো বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই নেপালের আগের অভিজ্ঞতা যদি বর্তমান সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে থাকে, তাহলে সেটিকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না।
আমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে, কোনো দেশ বিদেশি সহায়তা নিলে যেন তার আত্মমর্যাদা কমে যায়। বাস্তবতা তা বলে না।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলো একে অন্যের সহযোগিতা নেয়। কোথাও সরাসরি উদ্ধারকারী দল যায়, কোথাও চিকিৎসা সরঞ্জাম যায়, কোথাও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, আবার কোথাও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়।
একটি রাষ্ট্রের নিজের সক্ষমতা থাকতে হবে। পাশাপাশি এমন কূটনৈতিক সক্ষমতাও থাকতে হবে, যাতে প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া যায় এবং সেই সহযোগিতাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।
অর্থাৎ, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় বন্ধুর হাত ধরা, এই দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
নেপালের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন। দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর মাঝখানে থাকা দেশটির জন্য বিদেশি কোনো উদ্ধারকারী বা সামরিক দলের উপস্থিতি কেবল মানবিক বিষয় নয়, এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও কূটনীতির প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।
কোন দেশের দলকে ঢুকতে দেওয়া হবে, কাকে দেওয়া হবে না, কারা কতদিন থাকবে, তাদের কী ধরনের সরঞ্জাম থাকবে, এসব প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য সংবেদনশীল।
এ কারণে নেপাল যদি সব দেশের ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণ করে থাকে, তাহলে সেটিকে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
তবে আমার প্রশ্ন একটাই: ভূরাজনৈতিক হিসাব যেন কোনোভাবেই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে না যায়।
বাংলাদেশও দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, পাহাড়ধসসহ নানা বিপর্যয়ের সঙ্গে আমাদের মানুষের দীর্ঘদিনের বসবাস। তাই আমাদেরও নিজেদের উদ্ধার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, আধুনিক সরঞ্জাম, দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশাও এখানেই। জাতীয় নিরাপত্তা, মানুষের জীবন এবং দেশের স্বার্থের প্রশ্নে সরকার যেন কঠোর, স্পষ্ট ও আত্মমর্যাদাশীল নীতি অনুসরণ করে।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের চাপ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থও যেন জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান না পায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী রয়েছে, যারা বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে নানা কৌশল নিতে পারে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমীকরণ নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো দলকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে চূড়ান্তভাবে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না।
তবে দেশের মানুষের উদ্বেগকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী। দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিসহ বহু বিষয়ে সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকবে, আলোচনা থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় ভারতের ভূমিকা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করলে বরং অবিশ্বাস আরও বাড়বে।
আমাদের ভারতের সঙ্গে শত্রুতা প্রয়োজন নেই। আবার অন্ধ নির্ভরতাও প্রয়োজন নেই।
বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে নয়।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল জায়গা হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই নীতি থাকা প্রয়োজন।
যে দেশ বাংলাদেশের স্বার্থকে সম্মান করবে, বাংলাদেশও তার সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, সেখানে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত।
কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন করতে চায়, সেটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু বিদেশি কোনো শক্তিকে ব্যবহার করে দেশের নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা হলে সেটি অবশ্যই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিবেচনা করতে হবে।
তবে এসব বিষয়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন প্রমাণ, কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা।
নেপালের বর্তমান সিদ্ধান্তের সাফল্য শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় গিয়ে বিচার করতে হবে: তারা কি নিজের সক্ষমতায় দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে? আহতদের চিকিৎসা দিতে পারছে? নিখোঁজদের উদ্ধার করতে পারছে? মানুষের খাবার, পানি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
যদি পারে, তাহলে এটি হবে একটি আত্মনির্ভর রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত।
আর যদি নিজস্ব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের জীবন রক্ষা ব্যাহত হয়, তখন জাতীয় মর্যাদার সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
কারণ রাষ্ট্র মানুষের জন্য। পতাকা, সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসবের শেষ অর্থ মানুষ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমাদের একই শিক্ষা নেওয়া দরকার। দেশ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে, মানুষের স্বার্থকে সবার ওপরে রাখবে এবং কোনো বিদেশি শক্তির কাছে নত হবে না। আবার মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করতেও দ্বিধা করবে না।
আমার কাছে এটাই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় শক্তি।
সার্বভৌমত্ব মানে শুধু বাইরের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা নয়; সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো নিজের মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করার ক্ষমতা।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক