দেশি খাবার কি হারিয়ে যাচ্ছে? স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন
পান্তা-ইলিশ, খিচুড়ি, শাক-সবজি, দেশি মাছ, ভর্তা কিংবা মৌসুমি ফল। বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষি, জলবায়ু ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং খাদ্যের অপচয়ের কারণে সেই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যব্যবস্থা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
এই বাস্তবতায় প্রতি বছর ১৮ জুন পালিত হয় জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক টেকসই খাদ্যরসনা দিবস (Sustainable Gastronomy Day)। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো এমন খাদ্যব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা, যা মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করবে, কৃষকের জীবিকা নিশ্চিত করবে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই খাদ্য শুধু পুষ্টিকর খাবারের বিষয় নয়; এটি খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন ও ভোগের সঙ্গে জড়িত একটি সামগ্রিক ধারণা।
টেকসই খাদ্যরসনা কী?
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) টেকসই খাদ্যব্যবস্থাকে এমন একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যা বর্তমান প্রজন্মের খাদ্যচাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
সহজভাবে বলতে গেলে, এমন খাবার খাওয়া ও উৎপাদন করা, যা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, পুষ্টিকর, পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই।
বর্তমানে বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কৃষি ব্যবস্থা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের একটি বড় উৎস। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। ফলে খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য উৎপাদনের ধরন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির শক্তি
বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় উপাদান দিয়ে তৈরি শত শত ধরনের খাবার রয়েছে।
একসময় গ্রামীণ পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ছিল নানা ধরনের শাক, ডাল, দেশি মাছ, কচুশাক, কলার মোচা, কাঁঠালের বিচি, বিভিন্ন মৌসুমি ফল এবং নিজস্ব কৃষিজ পণ্য। এসব খাবার ছিল তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টিকর এবং পরিবেশবান্ধব।
পুষ্টিবিদদের মতে, ঐতিহ্যবাহী দেশি খাদ্যাভ্যাসে সাধারণত উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের পরিমাণ বেশি থাকে, যা মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও উপকারী।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
খাদ্যের অপচয়: এক বড় সংকট
বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ খাদ্যের অপচয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায় অথবা অপচয় হয়।
বাংলাদেশেও এই সমস্যা কম নয়। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ এবং ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়।
বিশেষ করে ফল, সবজি এবং মাছের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের অপচয় কমানো গেলে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন চাপে পড়ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষক ফসলের ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় খরা কৃষি উৎপাদনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কৃষি গবেষণা, কৃষকের প্রশিক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন একসঙ্গে প্রয়োজন।
স্থানীয় খাদ্যের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় ও মৌসুমি খাবারের ব্যবহার বাড়ানো টেকসই খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
বিদেশি বা দূরবর্তী অঞ্চল থেকে খাদ্য পরিবহনে জ্বালানি ব্যয় এবং কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্য তুলনামূলক কম পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, চালতা, বরই, শাক-সবজি এবং দেশি মাছের মতো পণ্য শুধু পুষ্টিকর নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
স্থানীয় খাদ্যের ব্যবহার বাড়লে কৃষকের আয় বাড়বে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং খাদ্যব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে।
কৃষক ও ভোক্তার যৌথ দায়িত্ব
টেকসই খাদ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু কৃষকের নয়; ভোক্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
খাদ্যের অপচয় কমানো, মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়া, স্থানীয় কৃষিপণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য কেনার অভ্যাস গড়ে তোলা এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে কৃষকদের জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, ন্যায্যমূল্য এবং নিরাপদ বাজারব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে টেকসই না করতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা
খাদ্য শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়; এটি সংস্কৃতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আজ আমরা কী খাচ্ছি এবং কীভাবে সেই খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের পৃথিবী।
আন্তর্জাতিক টেকসই খাদ্যরসনা দিবস আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থানীয় কৃষি, দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতি, খাদ্যের অপচয় রোধ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
সবুজ পৃথিবী ও নিরাপদ খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে আমাদের থালার খাবার নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
লেখক: এস এম মেহেদী হাসান, মুক্ত লেখক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জালালাবাদ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, ঢাকা। ই-মেইল:sm.mehedi.hasan1977@gmail.com