শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬০৭ বার দেখা
শেয়ার করুন

— এস এম মেহেদী হাসান | বিশেষ প্রতিবেদন | ২৮ মে ২০২৬—

পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব নারীর জীবনের স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এটি কোনো অসুখ নয়, লজ্জার বিষয়ও নয়। বরং একজন কিশোরীর নারী হয়ে ওঠার স্বাভাবিক ধাপ।

তবুও সমাজের নানা কুসংস্কার, সংকোচ এবং সচেতনতার অভাবে এখনো অনেক নারী ও কিশোরী পিরিয়ডের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। অনেকেই এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে ভয় পান। সেই নীরবতা ভাঙতে এবং সচেতনতা বাড়াতেই আজ ২৮ মে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ঋতুস্রাব স্বাস্থ্যবিধি দিবস’।

কেন ২৮ মে পালন করা হয়

বিশ্বজুড়ে পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য ২০১৪ সালে জার্মানিভিত্তিক সংস্থা ‘ওয়াশ ইউনাইটেড’ এই দিবস চালু করে।

২৮ মে তারিখটি বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে একটি বিশেষ কারণ।

একজন নারীর মাসিক চক্র সাধারণত ২৮ দিন পরপর হয়। আর গড়ে পিরিয়ড স্থায়ী হয় প্রায় ৫ দিন। তাই বছরের ৫ম মাসের ২৮ তারিখকে এই দিবসের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্ব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫০ কোটি নারী ও কিশোরী এখনো নিরাপদ পিরিয়ড ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

দেশের প্রায় ৪০ থেকে ৪১ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া কিশোরী পিরিয়ডের সময় স্কুলে যায় না। প্রতি মাসে গড়ে ২ থেকে ৩ দিন ক্লাস মিস করে তারা। এতে পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

গ্রামাঞ্চলের অনেক নারী এখনো স্যানিটারি প্যাডের বদলে পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন। অনেক সময় সেই কাপড় ঠিকমতো পরিষ্কার বা শুকানো হয় না। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা ভয়ংকর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন কাপড় বা দীর্ঘ সময় একই প্যাড ব্যবহার করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

এর মধ্যে রয়েছে:

  • ইউরিন ইনফেকশন বা প্রস্রাবে সংক্রমণ
  • ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ
  • জরায়ুর প্রদাহ
  • দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি
  • জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পরিচ্ছন্নতা খুব জরুরি

গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা রহমান বলেন,

“পিরিয়ডের সময় প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর পর প্যাড পরিবর্তন করা উচিত। যারা কাপড় ব্যবহার করেন, তাদের সেটি সাবান ও গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে। অন্ধকার বা ভেজা জায়গায় শুকানো কাপড় ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।”

তিনি আরও বলেন,

“পিরিয়ড কোনো অপবিত্রতা নয়, এটি সুস্থতার লক্ষণ। এই বার্তাটি পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।”

স্কুলে নিরাপদ পরিবেশ দরকার

শিক্ষাবিদ অধ্যাপিকা সুলতানা পারভীন বলেন,

“অনেক স্কুলে এখনো মেয়েদের জন্য আলাদা চেঞ্জিং রুম বা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা নেই। নিরাপদ টয়লেট ও পানি না থাকায় অনেক ছাত্রী স্কুলে আসতে ভয় পায়।”

তিনি মনে করেন, স্কুলে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

অর্থনৈতিক বাধাও বড় সমস্যা

উন্নয়নকর্মী নাহিয়ান আহমেদ বলেন,

“দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়ের জন্য স্যানিটারি প্যাড কেনা কঠিন। প্যাডের দাম কমাতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”

কী করতে হবে এখন

পরিবারে খোলামেলা আলোচনা

পিরিয়ড নিয়ে লজ্জা নয়, সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পরিবারে এ বিষয়ে স্বাভাবিক আলোচনা জরুরি।

স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা

প্রতিটি স্কুলে নিরাপদ টয়লেট, পানি ও প্যাডের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কম খরচে নিরাপদ প্যাড

গ্রামীণ ও দরিদ্র নারীদের জন্য কম খরচে স্বাস্থ্যসম্মত প্যাড সহজলভ্য করতে হবে।

মিডিয়ায় সচেতনতা বাড়ানো

নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে পিরিয়ডকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সমাজের সংকোচ কমে।

উপসংহার

যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুন প্রাণের জন্ম হয়, সেটিকে লজ্জা বা গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশ্ব ঋতুস্রাব স্বাস্থ্যবিধি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, পিরিয়ড নিয়ে নীরবতা নয়, সচেতনতা তৈরি করা। যেন প্রতিটি নারী ও কিশোরী নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে এই সময় পার করতে পারেন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন