নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস: মা ও নবজাতকের সুরক্ষায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
— এস এম মেহেদী হাসান | বিশেষ প্রতিবেদন | ২৮ মে ২০২৬
মা শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, মায়া আর জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে গিয়ে এখনো অনেক মাকে জীবন হারাতে হয়। প্রসবের সময় জটিলতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পুষ্টির অভাব ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক পরিবারে আনন্দের বদলে নেমে আসে শোক।
মাতৃত্ব যেন ভয় বা ঝুঁকির কারণ না হয়, বরং নিরাপদ ও আনন্দময় হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই আজ ২৮ মে পালিত হচ্ছে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’।
বাংলাদেশে ১৯৯৭ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন করা হচ্ছে। ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি পালনের অনুমোদন দেন।
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভবতী মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মাতৃমৃত্যু কমানো এবং গর্ভকালীন যত্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।
গত কয়েক দশকে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আগে যেখানে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশু জন্মে ৫০০-এর বেশি মায়ের মৃত্যু হতো, এখন সেই সংখ্যা কমে এসেছে প্রায় ১৩৫ থেকে ১৪০-এ।
তবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনতে হবে। তাই এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ সন্তান জন্ম হয় হাসপাতাল বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অনেক জায়গায় এখনো বাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের মাধ্যমে প্রসব করানো হয়, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
সন্তান জন্মের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এখনো মাতৃমৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ।
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে খিঁচুনি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
অনেক পরিবার প্রসবের জটিলতা শুরু হওয়ার পরও বাড়িতে অপেক্ষা করে। এতে মা ও শিশুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অনেক গর্ভবতী নারী পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। ফলে প্রসবের সময় শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের প্রাক্তন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি বিভাগ) ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া বলেন,
“গর্ভকালীন সময়ে অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো খুব জরুরি। অনেক পরিবার শেষ মুহূর্তে রোগীকে হাসপাতালে আনে। তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। আগে থেকেই কোথায় ডেলিভারি হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে কী করতে হবে, সেই পরিকল্পনা থাকা দরকার।”
সিনিয়র মিডওয়াইফ রাবেয়া বেগম বলেন,
“অনেক পরিবার মনে করে বেশি খেলে বাচ্চা বড় হবে এবং সিজার করতে হবে। এই ধারণা ভুল। গর্ভবতী মায়ের জন্য ডিম, দুধ, মাছ, মাংস ও শাকসবজি খুব প্রয়োজন।”
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক — এস এম মেহেদী হাসান বলেন,
“নিরাপদ মাতৃত্ব শুধু নারীর বিষয় নয়। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের মানসিক শান্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সবাইকে এই সময়ে সহযোগিতা করতে হবে।”
কম বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশুর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই বাল্যবিয়ে রোধ জরুরি।
গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজনে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও রক্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
গর্ভবতী মায়েদের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে স্বাস্থ্যকর্মীরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে সেই দেশের মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্যের ওপর। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি পরিবার ও সমাজেরও দায়িত্ব।
প্রতিটি মা যেন নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মাতৃত্ব হোক আনন্দের, আশঙ্কার নয়।