আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস: বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের গৌরবময় অবদান
এস এম মেহেদী হাসান | বিশেষ প্রতিবেদন | ২৯ মে —
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত আর অস্থিরতার মধ্যে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, আজ তাদের প্রতি সম্মান জানানোর দিন। প্রতি বছর ২৯ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ (International Day of UN Peacekeepers)।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যদের অবদান স্মরণ করা এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই দিবস পালন করা হয়।
১৯৪৮ সালের ২৯ মে জাতিসংঘের প্রথম শান্তিরক্ষা মিশন ‘UNTSO’ মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রা শুরু করে। ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য এই মিশন গঠন করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর ২৯ মে ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
এই দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিশ্বশান্তি রক্ষায় নিয়োজিত শান্তিরক্ষীদের অবদানকে সম্মান জানানো।
একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা এবং নতুন প্রজন্মকে বিশ্বশান্তির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা।
সাত দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম চলছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ থেকে ১২টি সক্রিয় শান্তিরক্ষা মিশন রয়েছে। এসব মিশনের বেশিরভাগ পরিচালিত হচ্ছে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে।
বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্য বিভিন্ন মিশনে কাজ করছেন।
এ পর্যন্ত বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য ও পুলিশ পাঠিয়েছে।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সীমান্তে ‘UNIIMOG’ মিশনে ১৫ জন সামরিক কর্মকর্তা পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা যাত্রা শুরু হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘ মিশনে শীর্ষ সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সততা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীরাও বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত।
হাইতি, কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানের মতো কঠিন মিশনে দায়িত্ব পালন করে তারা দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণকে নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে দেশটি বাংলা ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়।
এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্মানের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১৬০ জনের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।
তাদের এই আত্মত্যাগ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য গর্বের।
বর্তমানে শান্তিরক্ষীদের কাজ আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এখন তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে:
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি ও মানবতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনো সহজ ছিল না। তবুও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা প্রতিনিয়ত সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে বিশ্বের সব শান্তিরক্ষীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বিশেষ করে বাংলাদেশের সেই সব বীর সদস্যদের স্মরণ করি, যারা শান্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
তাদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতা ও শান্তির জন্য এখনো লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।