মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৫৫০ বার দেখা
শেয়ার করুন

আমির হোসাইন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় অবস্থিত হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিএনপির নাম ব্যবহার করে একটি পক্ষ আস্তানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে আস্তানায় ভক্তদের দান করা মোরগ-ছাগল তালা ভেঙে বিক্রি করে টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল আস্তানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সহসভাপতি, কোষাধ্যক্ষ ও সদস্যসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের উপেক্ষা করে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আস্তানা ঘরে কোষাধ্যক্ষের দেওয়া তালার ওপর নতুন তালা লাগানো হয়। পরে প্রকাশ্যে মোরগ-ছাগল রাখার ঘরের তালা ভেঙে ভক্তদের দান করা পশুপাখি বিক্রি করে টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনায় সাজিদুর রহমান গোলাপ ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন আস্তানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, অভিযুক্তরা স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তবে সংসদ সদস্যের নির্দেশনা বা এ ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে সাজিদুর রহমান গোলাপ প্রথমে আস্তানা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও সাংবাদিক আলম সাব্বিরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন। এর প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ, আস্তানা এলাকার বাসিন্দা ও বিভিন্ন গ্রামের মানুষ মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি একটি দল গঠন করে আস্তানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানাটি দীর্ঘদিন ধরে সর্বসাধারণের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সাল থেকে ওরস উদ্‌যাপন উপলক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে সহসভাপতি করে একটি সর্বজনীন ওরস উদ্‌যাপন কমিটি গঠিত হয়ে আসছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওরস চলাকালে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে পর্যালোচনা করা হয়।

এ ছাড়া সারা বছর হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) ভলান্টিয়ার ও খাদেম কল্যাণ সমিতির সদস্যরা বিনা পারিশ্রমিকে আস্তানায় সেবা দিয়ে থাকেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজ চলাকালে মসজিদের মাইকে নিজেকে আস্তানার সেক্রেটারি হিসেবে ঘোষণা দেন সাজিদুর রহমান গোলাপ। এ ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।

আস্তানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আস্তানা দখলের আশঙ্কা জানিয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

শাহ আরেফিন (রহ.) ভলান্টিয়ার ও খাদেমদের ভাষ্য, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রম ও সময় দিয়ে আস্তানায় সেবা করে আসছেন। কিন্তু একটি পক্ষ জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।

আস্তানা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব আলম সাব্বির বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এ পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছি। কিছুদিন ধরে একটি পক্ষ নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে কমিটি, খাদেম ও ভলান্টিয়ারদের উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে ভক্তদের দান করা মোরগ-ছাগল বিক্রি করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে।’

এদিকে অভিযুক্ত সাজিদুর রহমান গোলাপ ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের সংসদ সদস্যের লোকজন বলে দাবি করছেন এবং তাঁর নির্দেশনায় এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, বিএনপির তাহিরপুর উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানা দখল করে যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, তাদের কর্মকাণ্ডের দায় দল নেবে না।

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আস্তানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রিপা মনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। শাহ আরেফিন আস্তানা দখল করে নিজেরাই জোর করে ছাগল-মোরগ বিক্রি করার অভিযোগ পেয়েছি। এখানে কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এ সপ্তাহেই সভা করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে একটি পক্ষ জোরপূর্বক আস্তানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলে দেবেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাজিদুর রহমান গোলাপের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

আস্তানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সর্বসাধারণের ধর্মীয় ও সম্প্রীতির স্থান। তাই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন এর নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আস্তানার স্থাপনা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন