মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

দুর্যোগের বরাদ্দে দুর্নীতির ছায়া: জবাবদিহির বাইরে পিআইও-ডিআরআরও কার্যালয়?

৭ ঘণ্টা আগে • Editing Section
৫৩৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

দুর্যোগ মানুষের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই খাতের অর্থ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে যদি অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বিপদে পড়া মানুষের অধিকার হরণেরও শামিল।

দেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) কার্যালয় ঘিরে সাম্প্রতিক অডিট প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে ৩ হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩০টি গুরুতর। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সারা দেশে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন পিআইও ও ডিআরআরও বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে এবং ২৯ কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান কোনো সাধারণ প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় না; বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও নজরদারির বড় ধরনের ঘাটতির প্রশ্ন সামনে আনে।

মানুষের জন্য বরাদ্দ, কিন্তু সুবিধা কার?

টিআর, কাবিখা, কাবিটা, জিআর এবং হতদরিদ্রদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের অর্থ মূলত সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা। গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, ছোট অবকাঠামো নির্মাণ, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা—এসব কাজের জন্যই এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু এলাকায় প্রকল্পের নামে বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কাজ হয় না, অথবা কাজের তুলনায় বেশি বিল দেখানো হয়। কোথাও নামসর্বস্ব মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। তবে যদি অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে এর ক্ষতি বহুমাত্রিক। একটি গ্রামীণ রাস্তা সংস্কার না হলে কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সহায়তা না পেলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও বাস্তবে মানুষ তার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।

অব্যয়িত অর্থ জমা না দেওয়ার অভিযোগ

সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয় না হলে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সাধারণভাবে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর ৩০ জুনের মধ্যে ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত করে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা।

কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অডিটে কিছু পিআইও ও ডিআরআরওর বিরুদ্ধে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জিআর, টিআর, কাবিখা, কাবিটা এবং গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের অর্থ বছরের পর বছর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যাচ্ছে। এভাবে সরকারি অর্থ আটকে রাখা হলে তা আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি সরকারি হিসাব ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যারা অব্যয়িত অর্থ জমা না দিয়ে নিজেদের কাছে রেখেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উদ্যোগ যেন শুধু শোকজ বা বিভাগীয় মামলার ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারি অর্থ কোথায় গেছে, কারা এর সুবিধা নিয়েছে এবং কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে—এসব তথ্যও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।

একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর: অনিয়মের সুযোগ কোথায়?

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে সাধারণত তিন বছরের বেশি থাকার কথা নয়। অথচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু পিআইও ও ডিআরআরও পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। বদলির আদেশ ঠেকাতে কেউ কেউ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলাও করেছেন। দেশের ১১টি উপজেলায় কর্মরত পিআইওদের বদলি-সংক্রান্ত মামলার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার পেছনে ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক নানা কারণ থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দপ্তরে সরকারি বরাদ্দ, প্রকল্প নির্বাচন, কাজের তদারকি ও বিল অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, সেখানে নিয়মিত বদলি এবং কার্যকর তদারকি জরুরি।

তবে বদলিই দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র উপায় নয়। একজন কর্মকর্তাকে বদলি করে অন্যজনকে দায়িত্ব দিলেই অনিয়মের সংস্কৃতি বদলে যাবে না। প্রয়োজন প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।

অভিযোগ ফাইলবন্দি হলে দুর্নীতির সাহস বাড়ে

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পিআইও ও ডিআরআরওদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ জমা পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো অভিযোগ ফাইল থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব ঘটতে পারে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু মাঠপর্যায়ের দুর্নীতির বিষয় নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম করলেও যদি দপ্তরের ভেতরে প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগ আটকে দেওয়া যায়, তাহলে দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়ে। ফলে শুধু অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের বিবরণ, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর শুধু কাগজপত্র দেখে নয়, সরেজমিনে গিয়ে কাজের মান ও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

এ ছাড়া স্থানীয় জনগণকে প্রকল্প তদারকিতে যুক্ত করা যেতে পারে। কোন এলাকায় কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কী কাজ হওয়ার কথা এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে—এসব তথ্য সহজে জানার সুযোগ থাকলে অনিয়ম করা কঠিন হবে। অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদমর্যাদা বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অর্থ কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি জনগণের করের টাকা, যা দুর্যোগে বিপর্যস্ত ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা। সেই অর্থ আত্মসাৎ করা মানে বিপদে পড়া মানুষের প্রাপ্য সহায়তা কেড়ে নেওয়া। তাই পিআইও ও ডিআরআরও কার্যালয়ের অনিয়মের অভিযোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

মন্ত্রণালয় যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। ৩ হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি এবং ৯৩০টি গুরুতর আপত্তির নিষ্পত্তি শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপই পারে এই খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। দুর্যোগের সময় মানুষ যেন সহায়তার জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে—কোনো অসাধু কর্মকর্তা বা সিন্ডিকেটের দিকে নয়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন