শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৮ অপরাহ্ণ
ব্রেকিং
৫৬৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

আজ ৩১ অক্টোবর। বরগুনার বামনা অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গনের এক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব মো. লাল মিয়ার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। সততা, নীতিনিষ্ঠা, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের জন্য তিনি এলাকাবাসীর কাছে ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ। প্রবীণ এই সমাজসেবক ও ‘দৈনিক সাগরকূল’-এর সম্মানিত উপদেষ্টা ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে বামনা উপজেলার সোনাখালীতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর মৃত্যুতে বামনার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সাত বছর পরও তা অনুভব করেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসী। কারণ, মো. লাল মিয়া কেবল একজন সমাজসেবক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সামাজিক বিরোধে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার এক নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, ন্যায়পরায়ণ ও পরোপকারী। সমাজের ছোট-বড় সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। কারও বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধে মধ্যস্থতা করা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের নীতি ও বিবেককে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে ন্যায় ও সত্যের মূল্য ছিল বেশি।

এলাকার অনেক জটিল সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁর পরামর্শ ও ভূমিকা মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। তরুণদের ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে তিনি সময়োপযোগী পরামর্শ দিতেন। অন্যায় ও অনিয়মের কাছে মাথা নত না করার যে মানসিকতা তিনি ধারণ করতেন, তা তাঁর পরিচিতজনদের কাছেও ছিল অনুপ্রেরণার বিষয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রকৃত সম্মান পদ-পদবি কিংবা সম্পদের মধ্যে নয়; বরং সততা, চরিত্র ও মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যেই নিহিত।

স্থানীয় সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান

মো. লাল মিয়ার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে ছিল স্থানীয় সাংবাদিকতা ও প্রকাশনা শিল্প। ‘দৈনিক সাগরকূল’-এর উপদেষ্টা হিসেবে তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংবাদপত্রের নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, সংবাদমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা এবং সাধারণ মানুষের কথা বলা।

তরুণ সম্পাদক ও সাংবাদিকদের তিনি পেশাগত সততা বজায় রাখার পরামর্শ দিতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সাংবাদিকতার কলম কোনো প্রলোভন, ভয় কিংবা স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সত্য প্রকাশের সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করেছে।

সংবাদকর্মীদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত সংকটেও তিনি অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়াতেন। তাঁদের কাজের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গঠনমূলক পরামর্শ দিতেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিকাশ এবং সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে তাঁর এই ভূমিকা বামনা ও বরগুনার গণমাধ্যম অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সন্তানদের কর্মজীবনে পিতার আদর্শ

মো. লাল মিয়া তাঁর সন্তানদের মধ্যে সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা তাঁদের কর্মজীবনেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর চার সন্তান নিজ নিজ অবস্থান থেকে পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন।

বড় ছেলে মো. আইউব আলী বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

মো. নেছার উদ্দিন ‘দৈনিক সাগরকূল’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। পাশাপাশি তিনি ‘দৈনিক বর্তমান কথা’-এর বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং ‘দি ডেইলি মর্নিংগ্লোরী’-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সমন্বিত সাংবাদিক পরিষদের (এসএসপি) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি, আঞ্চলিক সংবাদপত্র পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বরিশাল মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বরগুনা জেলা শাখার সহসভাপতি ও বামনা উপজেলা শাখার সভাপতি। এ ছাড়া বরগুনা জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। সাংবাদিকতা, প্রকাশনা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর এই সম্পৃক্ততার পেছনে পিতার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌসী রিনা ‘দৈনিক সাগরকূল’-এর সহযোগী সম্পাদক এবং ‘দি ডেইলি মর্নিংগ্লোরী’-এর বামনা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বামনা প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত সাংবাদিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বামনা উপজেলা শাখার সহসভাপতি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

অন্য কন্যা মোসা. রেহেনা আক্তারও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তা। নিজের কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখছেন।

সন্তানদের পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে পিতার শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন পরিবারের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি তাঁদের পরিচিতজনদের কাছেও অনুপ্রেরণার।

সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা

মো. লাল মিয়ার কাজ শুধু সাংবাদিকতা বা সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বামনা ও বরগুনার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সামাজিক সংগঠন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা বিস্তার, তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করা এবং তাঁদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার বিষয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন।

এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদে পড়া মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো ছিল তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ। তিনি মনে করতেন, সমাজের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে হয় না; মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা গড়ে তোলাও জরুরি।

তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আপন করে তুলেছিল। কোনো পদ বা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের কারণে নয়, মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর কারণেই তিনি এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন।

স্মৃতিতে অমলিন এক মানুষ

মো. লাল মিয়ার মৃত্যুর সাত বছর পূর্ণ হলো। সময়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতি ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের কাজ ও আদর্শ মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। তিনি ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান আজও নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।

বর্তমান সময়ে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, অনিয়ম ও নৈতিকতার সংকট নিয়ে সমাজে নানা আলোচনা হয়, তখন মো. লাল মিয়ার মতো মানুষের জীবন ও আদর্শ স্মরণ করা আরও জরুরি। কারণ, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে শুধু দক্ষ মানুষ নয়, নীতিবান ও দায়িত্বশীল মানুষেরও প্রয়োজন। তিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন, মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি।

আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করার প্রার্থনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি রইল আন্তরিক সমবেদনা।

তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম, সততা ও আদর্শ বামনা তথা বরগুনার মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা যে মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জনের মধ্যে, মো. লাল মিয়ার জীবন তারই একটি উদাহরণ।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন