শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৬ অপরাহ্ণ
ব্রেকিং

পরিকল্পিত নগরায়ণ: বাসযোগ্য শহর গড়তে বাংলাদেশের করণীয়

১ ঘণ্টা আগে • Editing Section
৫২৭ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শহর দিবস। নগরায়ণের গুরুত্ব, শহরগুলোর নানা সমস্যা এবং সেগুলোর টেকসই সমাধান নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করতেই জাতিসংঘ এ দিবসের উদ্যোগ নিয়েছে। এবারের দিনটিও আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে পারছি, নাকি শুধু ভবন, সড়ক ও অবকাঠামোর বিস্তারকেই উন্নয়ন বলে ধরে নিচ্ছি?

একুশ শতকে নগরায়ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। শহরকে ঘিরেই গড়ে উঠছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা, আধুনিক সেবা ও নতুন কর্মক্ষেত্র। উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে। কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়া এই নগরায়ণই আবার মানুষের জীবনে নানা সংকট তৈরি করছে। যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, আবাসন সমস্যা, খেলার মাঠ ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়া—এসব এখন অনেক শহরের পরিচিত চিত্র।

তাই বিশ্ব শহর দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের বিষয় নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহরকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলাই নগর উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বিশ্ব শহর দিবসের সূচনা ও তাৎপর্য

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩১ অক্টোবরকে বিশ্ব শহর দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর চীনের সাংহাই শহরে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপিত হয়। ‘Better City, Better Life’—অর্থাৎ ভালো শহর, উন্নত জীবন—এই ধারণাকে সামনে রেখে দিবসটির সূচনা।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১ নম্বর লক্ষ্যেও নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল ও টেকসই শহর গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ, নগর উন্নয়নের সুফল যেন শুধু বিত্তবান বা বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন শিশু, একজন প্রবীণ কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও যেন শহরে নিরাপদে চলাচল ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের গতি দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ শহরে বসবাস করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ নগরাঞ্চলে বসবাস করতে পারেন। এই পরিবর্তন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু শহরের পরিকল্পনা, পরিবহন, আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই অনুপাতে উন্নত না হলে জনসংখ্যার চাপ একসময় বড় সংকটে পরিণত হবে।

নগরায়ণের সম্ভাবনা আছে, সংকটও কম নয়

শহর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং নানা ধরনের ব্যবসা ও সেবা গড়ে ওঠে। বিভিন্ন শ্রেণি ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস শহরকে বৈচিত্র্যময় করে। নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রও তৈরি হয় নগরকে ঘিরে।

কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল্যও কম নয়। শহরের আশপাশের কৃষিজমি, খাল, পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে আবাসন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি হলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা বাড়ে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজের কারণে বায়ুদূষণও বাড়ছে।

আবাসন সংকট আরেকটি বড় সমস্যা। শহরে কাজের সুযোগ থাকলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থান পাওয়া কঠিন। ফলে অনেককে অস্বাস্থ্যকর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকতে হয়। সেখানে বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশের অভাব থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় শহরগুলোও বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের শহরগুলো কোথায় দাঁড়িয়ে?

বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি দ্রুত। রাজধানী ঢাকা দেশের প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরেও জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নাগরিক সুবিধা, অবকাঠামো ও পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটেনি।

ঢাকার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নত চিকিৎসাসেবা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। অথচ রাজধানীর সড়ক, গণপরিবহন, আবাসন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। এতে শুধু কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে না, মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জলাবদ্ধতা এখন ঢাকাসহ অনেক শহরের নিয়মিত সমস্যা। খাল, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার দখল বা ভরাটের ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারে না। কোথাও কোথাও অপরিকল্পিত সড়ক ও ভবন নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সন্তোষজনক নয়। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং ড্রেনের মধ্যে বর্জ্য জমে থাকা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও নিয়ম মানার ঘাটতি রয়েছে। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা, সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না রাখা এবং অগ্নিনিরাপত্তার দুর্বলতা নগরবাসীর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি শহরে শুধু ভবন থাকলেই হয় না; সেই ভবনে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা, চলাচল ও জরুরি সেবার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।

পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য যা জরুরি

প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর নগর পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। রাজধানীসহ প্রতিটি শহরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন এলাকায় আবাসিক স্থাপনা হবে, কোথায় শিল্পকারখানা, কোথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পার্ক ও খেলার মাঠ থাকবে—এসব নির্ধারণ করতে হবে জনসংখ্যা ও পরিবেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে। পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হলে কোনো লাভ হবে না। তাই অনুমোদনহীন স্থাপনা, জলাশয় দখল ও নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমাতে হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের ঢাকামুখী চাপ কমবে। শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই বিকেন্দ্রীকরণ হয় না; মানুষের প্রয়োজনীয় সেবা নিজ নিজ অঞ্চলে পৌঁছে দিতে হয়। শিল্পকারখানা ও ব্যবসার সুযোগও রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দিতে হবে।

তৃতীয়ত, গণপরিবহনকে মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মেট্রোরেল, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিরাপদ হাঁটার পথ এবং সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাতে না পারলে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চতুর্থত, জলাশয়, খাল, নদী ও সবুজ জায়গা রক্ষা করতে হবে। শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। পার্ক, খেলার মাঠ, গাছপালা ও ছাদবাগান বাড়ানো গেলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎস থেকেই বর্জ্য আলাদা করা, পুনর্ব্যবহার এবং আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

পঞ্চমত, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনকে নগর পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। শহরের উন্নয়ন হবে, অথচ শ্রমজীবী মানুষ নিরাপদ বাসস্থান পাবে না—এমন উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। পরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন এবং নিরাপদ বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শহর উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে

নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, অনেক সময় অবকাঠামো নির্মাণকেই উন্নয়নের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়। অথচ একটি উড়ালসেতু, মেট্রোরেল বা বহুতল ভবন শহরের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এসব অবকাঠামো মানুষের জীবন কতটা সহজ করছে, পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং শহরের সব শ্রেণির মানুষ এর সুবিধা পাচ্ছে কি না—সেটিই বিবেচনায় নিতে হবে।

এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, জলাশয় দখল বা পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং নগর কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি দাবি করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিকল্পনা প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ, সেবা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম বন্ধ করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের।

বিশ্ব শহর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহরের উন্নয়ন মানে শুধু আয়তন বৃদ্ধি কিংবা আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ নয়। একটি শহর তখনই উন্নত, যখন সেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে, সাশ্রয়ী বাসস্থান পায় এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা সহজে গ্রহণ করতে পারে।

আজকের পরিকল্পনার ভুল আগামী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করতে পারে। তাই নগর উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, পরিকল্পনাবিদ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

৩১ অক্টোবরের বিশ্ব শহর দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের শহরগুলোকে নতুন করে ভাবার আহ্বান। আমরা কেমন শহর চাই—শুধু বড় শহর, নাকি বাসযোগ্য শহর? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে আমাদের নগরায়ণের ভবিষ্যৎ। পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সবুজ ও সবার জন্য সমান সুযোগসমৃদ্ধ শহর গড়ে তুলতে পারলেই বিশ্ব শহর দিবসের অঙ্গীকার বাস্তব অর্থ পাবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন