শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:১১ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৫৮৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

কিশোর গ্যাং রাজনীতির বিষবৃক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সংকট

এস এম মেহেদী হাসান

একই সমাজের ভেতরে যখন মায়া-মমতায় বেড়ে ওঠা একটি শিশু আরেকটি শিশুর জন্য জল্লাদ হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা শুধু অপরাধের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পরিবার, সমাজ, মূল্যবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা।

সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জায়গা থেকে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রীতমের (১৩) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। একটি আইফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিচিত ‘বড় ভাই’ ও বন্ধুদের হাতে পিটিয়ে এক কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, আমাদের পুরো সমাজের জন্যই বড় সতর্কবার্তা।

অপ্রীতমের এই করুণ পরিণতিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার এবং তাদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে অনেক দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে।

সামাজিক অপরাধের দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ এখন আর শুধু স্কুলের মারামারি বা পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো ঝামেলার মধ্যে নেই। কোথাও কোথাও এটি সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং রাজনৈতিক পেশিশক্তির সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠছে।

অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন এলাকায়

বিভিন্ন গবেষণা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বর্তমানে অন্তত ৩৮৬টিরও বেশি কিশোর গ্যাং বা অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই দেড় শতাধিক গ্যাংয়ে প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ তরুণ সক্রিয় থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ময়মনসিংহের মতো শহর ও শিল্পাঞ্চলেও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অপ্রীতম হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু কুমিল্লাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গত এক দশকে সেখানে উঠতি বয়সী অপরাধীদের হাতে অন্তত ১৫ জন মানুষের প্রাণ গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আগে কিশোর অপরাধ বলতে স্কুলে মারামারি, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বা পাড়া-মহল্লায় ছোটখাটো ঝামেলাকেই বেশি বোঝানো হতো। এখন কিছু কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে রামদা, চাপাতি, সামুরাই, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রও।

আধিপত্য বিস্তার, মোটরসাইকেল দিয়ে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং, ছিনতাই এবং হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার খবর আসছে। টিকটক, ফেসবুক রিল ও মেসেঞ্জার গ্রুপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কখনো কখনো নিজেদের শক্তি দেখানো, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া কিংবা সংঘর্ষের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কেন তৈরি হচ্ছে এই কিশোর গ্যাং?

প্রশ্ন হলো—আমাদের সন্তানেরা কেন এত অল্প বয়সে গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে?

এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং দ্রুত টাকা ও জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

এক. রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি

কিশোর গ্যাং তৈরির পেছনে স্থানীয় রাজনীতির একটি অংশের ভূমিকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়ানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, জমি দখল, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা চাঁদাবাজির মতো কাজে একশ্রেণির স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিশোরদের ব্যবহার করেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া, মাদকের সঙ্গে জড়ানো এবং অপরাধের পর তাদের আইনি ঝামেলা থেকে বের করে আনার চেষ্টা—এসব অভিযোগও রয়েছে।

ফলে কোনো কোনো কিশোরের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে—‘বড় ভাই সঙ্গে থাকলে পুলিশ কিছু করতে পারবে না।’

এই আশ্রয়-প্রশ্রয় তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে।

তবে সব কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রাজনৈতিক নেতা বা ‘গডফাদার’ আছেন—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। যেখানে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।

কারণ শুধু কিশোরদের ধরে নিয়ে গেলে হবে না। তাদের পেছনে যারা আছে, যদি সত্যিই কেউ থাকে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

দুই. পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তন

আজকের পরিবারও আগের মতো নেই। যৌথ পরিবার কমে গেছে, একক পরিবার বেড়েছে। বাবা-মা দুজনই ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় সন্তানকে সময় দেওয়া বা তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সুযোগও কমে যায়।

এর সঙ্গে আছে খেলার মাঠের সংকট। অনেক জায়গায় মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কম, পাঠাগার নেই বা থাকলেও নিয়মিত কার্যক্রম নেই।

ফলে কিশোরদের অবসর সময়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে কোনো অপরাধের কারণ নয়। কিন্তু এর অপব্যবহার, সহিংস ভিডিও, অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল বন্ধুত্ব কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

পরিবারের দায়িত্ব তাই শুধু সন্তানকে শাসন করা নয়। সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী দেখছে এবং তার আচরণে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও নজর রাখা দরকার।

তিন. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অন্যের দামি পোশাক, মোবাইল, গাড়ি কিংবা বিলাসী জীবনযাপন খুব সহজেই চোখে পড়ে। এর প্রভাব কিশোরদের ওপরও পড়তে পারে।

অনেকে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হতে চায়, দামি জিনিস ব্যবহার করতে চায়। পরিশ্রম করে সময় নিয়ে কিছু অর্জনের বদলে দ্রুত টাকা পাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

অপ্রীতমের দামি আইফোনকে কেন্দ্র করে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, সেটি আমাদের সামনে একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। একটি ফোনের জন্য একটি প্রাণ চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে কোনো দামি ফোন বা পণ্য নিজে অপরাধের কারণ নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য বৈধ পথের বদলে অপরাধকে সহজ পথ মনে করা হয়।

আইনগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থার গলদ

কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু অভিযান চালিয়ে কিশোরদের গ্রেপ্তার করা বা তালিকা তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

এখানে বড় একটি বিষয় হলো আইন।

শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের মতো বিচার করা যায় না। শিশুদের জন্য আলাদা বিচার ও সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো শিশুকে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে যাতে অপরাধের পেছনে থাকা বড়রা পার পেয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কিশোর অপরাধীরা গ্রেপ্তারের পর আইন অনুযায়ী জামিন পেতে পারে কিংবা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেসব জায়গায় গিয়ে তারা কতটা সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছে?

আমাদের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধনাগারগুলোর পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নতুন করে দেখা দরকার।

শুধু একটি কিশোরকে আটকে রাখলেই সে অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে, শিক্ষা দিতে হবে এবং সমাজে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে।

সমাধানের পথ কী?

এই সমস্যা সমাধানে শুধু পুলিশের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

অপরাধের পেছনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে

কিশোরদের যারা অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের আশ্রয় দিলে তদন্তের মাধ্যমে তার ভূমিকা বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

শুধু ডালপালা ছেঁটে লাভ নেই; অপরাধের পেছনের শিকড়ও খুঁজে বের করতে হবে।

পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে

সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, হঠাৎ দামি জিনিসপত্র তার হাতে আসছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।

তবে শুধু শাসন নয়, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলাও জরুরি।

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সংস্কার দরকার

শিশু আইনের মানবিক দিক ঠিক রেখেই সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে কার্যকর বিচার ও সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং, কারিগরি শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে খেলার মাঠ রাখতে হবে। স্কুলে খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিতর্ক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে।

কিশোরদের শক্তি যদি ভালো কাজে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে তাদের অনেককেই অপরাধের পথ থেকে দূরে রাখা সম্ভব।

শেষ কথা

অপ্রীতমের রক্তভেজা মরদেহ শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

সারাদেশে ৩৮৬টিরও বেশি কিশোর গ্যাং, শুধু ঢাকায় দেড় শতাধিক গ্যাংয়ে ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ তরুণের সক্রিয় থাকার তথ্য এবং কুমিল্লায় গত এক দশকে অন্তত ১৫ জন মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তোলার মতো।

তবে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে সব কিশোরকে সন্দেহের চোখে দেখলে চলবে না। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোর এবং সাধারণ কিশোরদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

আজকের একটি কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক। তাকে অপরাধের পথে ঠেলে দিলে ক্ষতি শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।

কিশোরদের হাতে অস্ত্র ওঠার আগেই যদি তাদের হাতে বই, কলম, খেলাধুলার সরঞ্জাম এবং সৃজনশীল কাজ তুলে দেওয়া যায়, তাহলে অনেক অপ্রীতমকে হয়তো অকালে হারাতে হবে না।

কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে তাই একদিকে যেমন অপরাধী চক্র ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবার, ভালো শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

সময় থাকতে এই সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন