শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

আগে অভাবে মানুষ বিক্রি হতো, এখন কি শখের জন্য সন্তানও বিক্রি হয়?

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • Editing Section
৫৯৪ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

জাতীয় জাদুঘরের কাচের বাক্সে রাখা দুটি পুরোনো বাংলা দলিল। দুই শতাধিক বছর আগের সেই দলিল দুটির দিকে তাকালে প্রথমে চোখে পড়ে কয়েকটি নাম, কিছু টাকার অঙ্ক আর বিক্রির শর্ত। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এগুলো কাগজে লেখা কয়েকটি লেনদেন নয়; এগুলো মানুষের অসহায় জীবনের নির্মম দলিল।

একটি দলিলে ছয় বছরের একটি মেয়েকে ১৩ টাকা সিক্কায় বিক্রির কথা লেখা। অন্যটিতে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ নিজের স্বাধীনতাই বিক্রি করে দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। বিনিময়ে পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন টাকা সিক্কা।

১৮০৭ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ পরগনার হাসানপুর চাকলার বাসিন্দা সদারাম দাস তাঁর ছয় বছরের মেয়েকে কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে বিক্রি করেছিলেন। দলিলের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মেয়েটির নাম জানা যায়নি। কেন তাঁকে বিক্রি করা হয়েছিল, তারও স্পষ্ট উল্লেখ নেই। তবে গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে দারিদ্র্য ও ঋণের মতো অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে।

পরের বছর, ১৮০৮ সালে, শেখ মামুদ স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ নিজেকেও একই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছিলেন। চারজন মানুষের বিনিময়ে তিনি পেয়েছিলেন সাড়ে তিন টাকা সিক্কা। দলিলে বিক্রির কারণ হিসেবে খাবার ও কাপড়ের প্রয়োজনের কথা লেখা হয়েছিল।

একবার শুধু সেই দৃশ্যটি কল্পনা করুন। একজন বাবা। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। ঘরে খাবার নেই, পরনের কাপড়ের নিশ্চয়তা নেই। বেঁচে থাকার আর কোনো পথও নেই। শেষ পর্যন্ত নিজের স্বাধীনতার সঙ্গে স্ত্রী ও সন্তানদেরও তুলে দিতে হচ্ছে অন্যের হাতে।

এটা কোনো গল্প নয়। দলিলে লেখা ইতিহাস।

সেই সময়ের মানুষকে আজকের চোখে বিচার করা সহজ। কিন্তু ক্ষুধা, ঋণ, দুর্ভিক্ষ কিংবা বন্যা একজন মানুষকে কতটা অসহায় করে দিতে পারে, সেই বাস্তবতাও বুঝতে হবে। দারিদ্র্য কখনো মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে বেঁচে থাকাটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় লড়াই।

ইতিহাস কি সত্যিই শুধু অতীত?

আজ অবশ্য আমরা সেই সমাজে বাস করি না। মানুষ কেনাবেচার সেই প্রথা নেই। একজন মানুষ অন্য মানুষের সম্পত্তি হতে পারেন না। দাসপ্রথার সেই অন্ধকার অধ্যায় এখন ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস কখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না। কখনো কখনো বর্তমান এসে তার সামনে দাঁড়ায়।

গত ২৯ আগস্ট পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় আইফোন কেনার জন্য দেড় বছরের শিশুপুত্র মুসাকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে এক কাঠমিস্ত্রি বাবার বিরুদ্ধে। উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামের মুন্সিবাড়ি এলাকার মো. মারুফের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে। শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ অভিযান শুরু করে।

ঘটনাটির সত্যতা অবশ্যই তদন্তের বিষয়। তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আসলে কী ঘটেছিল। তবে পরবর্তীতে পুলিশ পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলার চর কাজল গ্রামের ইমরান হোসেনের শ্বশুরবাড়ি থেকে শিশু মুসাকে উদ্ধার করে।

পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে দশমিনা থানায় নিয়ে আসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর উপস্থিতিতে তাকে তার দাদা মফিজ মুন্সী ও দাদি মাহফুজা বেগমের জিম্মায় নিরাপদে তুলে দেওয়া হয়।

দুইশ বছর আগে মানুষ অভাবের কারণে সন্তান বিক্রি করত। আজ যদি শখের জন্য সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠে, তাহলে আমরা আসলে কতটা এগিয়েছি?

একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে ভোগের আকাঙ্ক্ষা

অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করলে একটি পার্থক্য খুব স্পষ্ট। শেখ মামুদের দলিলে খাবার ও কাপড়ের প্রয়োজনের কথা লেখা আছে। ইতিহাসের বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা যায়, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, প্লাবন ও চরম দারিদ্র্যের সময় মানুষ অনাহার থেকে বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজেকে কিংবা স্ত্রী-সন্তানকে বিক্রি করে দিত।

এটি কোনোভাবেই সেই কাজকে বৈধ বা গ্রহণযোগ্য করে না। বরং বোঝায়, দারিদ্র্য একজন মানুষকে কতটা অসহায় করে দিতে পারে।

কিন্তু আজকের অভিযোগটি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

একদিকে বেঁচে থাকার তাগিদ, অন্যদিকে একটি ভোগ্যপণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা। এই পার্থক্যটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়।

একটি ফোন কেনার ইচ্ছা কীভাবে একজন মানুষের কাছে নিজের সন্তানের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে—এ প্রশ্ন শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

আমরা কী চাই? কী কিনতে চাই? অন্যের কাছে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করতে চাই? নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য কোথায় গিয়ে থামতে হবে? এসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা কতটা ভাবি?

মানুষ বিক্রির ইতিহাস কি সত্যিই শুধু ইতিহাস?

বাংলায় মানুষ বিক্রির ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছিল না। জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত দলিল, বিভিন্ন সময়ের নথি, পর্যটকদের বিবরণ ও গবেষণায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

আকবর আলি খানের গবেষণায় বাংলার স্থানীয় মানুষদের দাস হিসেবে বিক্রির বিভিন্ন দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে। সেখানে নিঃস্ব স্বাধীন ব্যক্তি, স্বাধীন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল শিশু, আগে কেনা দাস এবং দাসদের সন্তান—এমন কয়েক ধরনের মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ দাসপ্রথার শিকার শুধু যুদ্ধবন্দী কিংবা দূরদেশ থেকে ধরে আনা মানুষ ছিল না। বাংলার দরিদ্র ও নির্ভরশীল মানুষও এই ব্যবস্থার শিকার হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার উল্লেখ করে জানা যায়, তৎকালীন নথি ও সাক্ষ্যে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট থেকে ছেলে ও মেয়েশিশুদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ইউরোপীয়দের অনেকে কম দামে এসব শিশু কিনে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করতেন।

সিলেটেও মানুষ বিক্রির দলিল পাওয়া গেছে। ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালের কয়েকটি নথিতে নিজেকে বিক্রি করা, মা-ছেলেকে বিক্রি করা এবং শিশু বিক্রির তথ্য রয়েছে। এমনকি ১৭৯০ সালের একটি নথিতে অভাবের কারণে চার বছরের শিশু জমিয়তকে বিক্রির কথাও পাওয়া যায়।

এই দলিলগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—ইতিহাস শুধু আমাদের জানায় না কী ঘটেছিল; মাঝে মাঝে ইতিহাস আমাদের জিজ্ঞেস করে, আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।

মানুষ কি আবার পণ্যে পরিণত হচ্ছে?

আজ দাসপ্রথা নেই। কিন্তু মানুষকে পণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা কি পুরোপুরি শেষ হয়েছে? প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়।

আমাদের সমাজে ভোগের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। কে কী ব্যবহার করছে, কার হাতে কোন ফোন, কার বাড়ি কত বড়, কে কী কিনল—এসব বিষয় অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে। দামি ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়, অনেকের কাছে সেটি হয়ে উঠছে পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক।

সমস্যা ফোনে নয়। সমস্যা তখনই, যখন কোনো বস্তু কেনার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব ও মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যায়।

একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য অনেক কিছু করতে চান। তার ভালো থাকা, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ—সবই তাঁদের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সন্তানের চেয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বড় করে দেখার মুহূর্তে সম্পর্কের জায়গায় মালিকানার ধারণা ঢুকে পড়ে।

সন্তান কোনো সম্পত্তি নয়। তাকে কেনা বা বিক্রি করা যায় না। তার জীবন ও ভবিষ্যৎ কোনো বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সম্পদও নয়।

একটি শিশুর মূল্য এক লাখ টাকা নয়, এক কোটি টাকাও নয়। কোনো অর্থমূল্য দিয়ে একটি শিশুর জীবন, ভবিষ্যৎ কিংবা অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানুষত্ব

অতীতের সেই দলিলগুলোর দিকে তাকিয়ে আমরা সহজেই বলতে পারি—কী ভয়াবহ সময় ছিল! কিন্তু শুধু অতীতের মানুষকে বিচার করলে ইতিহাসের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। কারণ সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, জীবনযাপন বদলায়; কিন্তু মানুষের মূল্যবোধ নিজে থেকেই বদলে যায় না।

একসময় অভাব মানুষকে বাধ্য করেছিল। আজ যদি প্রয়োজনের বাইরে কোনো শখ বা ভোগের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এমন ভয়াবহ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি আমাদের সামাজিক পরিবর্তনের একটি অস্বস্তিকর দিক সামনে আনে।

আমাদের সন্তান কি আমাদের সম্পত্তি? না। সন্তান আমাদের দায়িত্ব। তার জীবন তার নিজের। তার অধিকারও তার নিজের। এই সহজ কথাটি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, দামি পোশাক পরানো কিংবা নতুন ফোন কিনে দেওয়া ভালোবাসার একমাত্র প্রমাণ নয়। সন্তানের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে নিজের ইচ্ছার ওপরে রাখা—সেটিই দায়িত্বশীলতার বড় পরিচয়।

জাতীয় জাদুঘরের সেই দুটি দলিল আজ কাচের বাক্সে রাখা। ছয় বছরের মেয়েটির নাম আমরা জানি না। জানি না, তার পরিণতি কী হয়েছিল। শেখ মামুদ ও তাঁর পরিবারের পরবর্তী জীবনও ইতিহাসের কাছে অজানা। কাগজে রয়ে গেছে শুধু নাম, টাকার অঙ্ক আর বিক্রির শর্ত।

কিন্তু সেই অজানা মানুষগুলোর জীবন আজও আমাদের প্রশ্ন করে।

তখন মানুষ অভাবের কাছে হেরে গিয়েছিল। আজ আমাদের যেন ভোগের কাছে হারতে না হয়।

কারণ দারিদ্র্য মানুষকে অসহায় করে, কিন্তু বিবেকের দারিদ্র্য মানুষকে অমানবিক করে তুলতে পারে। আমরা হয়তো আর মানুষ বিক্রি করি না। কিন্তু মানুষকে কতটা মূল্য দিই, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রতিদিনের আচরণেই লেখা হয়।

একটি আইফোন পুরোনো হবে। নতুন মডেল আসবে। দামি জিনিসের আকর্ষণ একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু একটি শিশুর জীবন একবার হারিয়ে গেলে কোনো নতুন মডেল দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না।

তাই আমাদের সামনে শুধু একটি অভিযোগের তদন্ত বা একটি ঘটনার বিচার নয়; নিজেদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন আছে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ জিনিসের চেয়ে বড় হবে?

উত্তরটি শুধু রাষ্ট্র বা আইনের কাছে নেই। উত্তরটি আমাদের প্রত্যেকের কাছে।

কারণ সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা কতটা দামি জিনিস কিনতে পারি, তা নয়। সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—কোনো মূল্যের বিনিময়েই আমরা একজন মানুষকে পণ্য হতে দিই না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্ত লেখক ও সাংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন