শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি: স্বচ্ছ পুনঃযাচাইয়ে শেষ হোক বিতর্ক

৩ আগস্ট ২০২৬ • Editing Section
৭২২ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

কোনো গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রতীক। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগও সেই দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্র জানাতে চেয়েছে, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে যারা শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের ত্যাগকে সম্মান জানানো হবে।

কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন তালিকা প্রকাশের পর নানা ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিযোগ উঠেছে, কিছু ব্যক্তি প্রকৃত আহত না হয়েও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আবার এমনও অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নন বা যাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁরাও বিভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, প্রকৃত আহত কিংবা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েও অনেকে তালিকার বাইরে থেকে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যদি বিতর্কিত হয়ে পড়ে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত দাবিদাররাই।

সরকার ইতোমধ্যে কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করেছে এবং কয়েকজনের গেজেট বাতিলও করেছে। এটি প্রমাণ করে, প্রাথমিক তালিকায় অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি বা অনিয়ম ছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সংশোধন কি যথেষ্ট? নাকি পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও একবার নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন? এই প্রশ্ন এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

বিশেষ করে “গ” শ্রেণির তালিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। সংখ্যাগতভাবে এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির পরিমাণ বেশি হওয়ায় যাচাইয়ের কাজও তুলনামূলক জটিল। অনেক বিশ্লেষক ও নাগরিক মনে করেন, একটি পূর্ণাঙ্গ পুনঃযাচাই হলে একদিকে যেমন প্রকৃত আহতদের অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অযাচিত বিতর্কেরও অবসান ঘটবে।

একজন প্রকৃত জুলাই যোদ্ধার কাছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি শুধু একটি সনদ নয়। এটি তাঁর ত্যাগের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। ফলে যদি অযোগ্য কেউ একই স্বীকৃতি পেয়ে যান, তাহলে প্রকৃত যোদ্ধাদের সম্মানই খাটো হয়ে যায়। রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন হয়।

এ কারণে পুনঃযাচাইকে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। যাঁরা প্রকৃত আহত, তাঁদের জন্য স্বচ্ছ যাচাই আরও সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করবে। আর যদি কেউ মিথ্যা তথ্য, ভুয়া নথি বা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই ন্যায়বিচারের দাবি।

এই পুনঃযাচাই প্রক্রিয়া কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, যাচাই কমিটিকে হতে হবে বহুমাত্রিক ও নিরপেক্ষ। শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নয়, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, স্থানীয় সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও যুক্ত করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রে হাসপাতালের চিকিৎসা নথি, মেডিকেল রিপোর্ট, ঘটনার সময়কার তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রমাণ সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতার ওপর।

একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি তথ্যও সত্য নয়। তাই কোনো ব্যক্তিকে কেবল গুজব বা রাজনৈতিক মতভেদের কারণে “ভুয়া” আখ্যা দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি সব অভিযোগকে অগ্রাহ্য করাও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না। সত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো প্রমাণনির্ভর তদন্ত।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে পরবর্তীকালে তালিকা সংশোধন, পুনর্মূল্যায়ন কিংবা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। একটি পরিণত রাষ্ট্র নিজের ভুল সংশোধন করতে সংকোচ বোধ করে না। বরং প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করাই পরিপক্বতার পরিচায়ক।

জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সেই মানসিকতা প্রয়োজন। কারণ এটি কেবল একটি প্রশাসনিক তালিকা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেই দলিলে ভুল থাকলে ভবিষ্যতের ইতিহাসও বিভ্রান্ত হবে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই সরকারি ভাতা বা বিশেষ সুবিধার চেয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানকেই বড় মনে করেন। তাঁদের প্রত্যাশা, ইতিহাসে তাঁদের ভূমিকা যেন যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়। সেই স্বীকৃতি যেন বিতর্কমুক্ত থাকে।

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের স্বীকৃতিও হতে হবে নির্ভুল, স্বচ্ছ এবং প্রশ্নাতীত। কারণ ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। আর সেই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য পুনঃযাচাই প্রক্রিয়া।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে সারা দেশে অনেক আন্দোলনকারী গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হন। তাঁদের অনেকে কারাবন্দিও ছিলেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী আদেশে তাঁদের অনেকেই মুক্তি পান। তাঁদেরই একজন মৌলভীবাজারের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা মতিন বকশ। তাঁর দাবি, ২৮ জুলাই রাতে পুলিশ তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে এবং ৬ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের সঙ্গে জেলা জামায়াতের আমির সাহেদ আলীসহ আরও ১২ থেকে ১৩ জন কারাবন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা সরকারি ভাতা বা অন্য কোনো সুবিধা চাই না। আমরা চাই রাষ্ট্র আমাদের ত্যাগের মর্যাদা দিক। সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

বিএনপি নেতা মতিন বকশের দাবি, মৌলভীবাজার জেলায় প্রকৃত আহতের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। অথচ সরকারি গেজেটে শতাধিক ব্যক্তিকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা তাঁর কাছে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অনেকেই ভুয়া কাগজপত্র বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তাই তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দাবিদারদের নিশ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হোক।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মৌলভীবাজারের সম্মুখসারির ছাত্রনেতা রাব্বি মিয়ার মতে, জুলাই আন্দোলনে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, মূলত তাঁরাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিদার। তাঁর দাবি, মৌলভীবাজার জেলায় প্রকৃত আহতের সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জনের বেশি নয়। অথচ সরকারি গেজেটের ‘গ’ শ্রেণির তালিকায় একশোরও বেশি ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, “অনিয়ম বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কেউ তালিকাভুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তা শুধু প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি অবিচারই নয়, আমাদের আন্দোলনের ইতিহাসের জন্যও কলঙ্কজনক।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পুনঃযাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত দাবিদারদের নিশ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হোক।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন