শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

বিশ্ব বালাইনাশক দিবস ২০২৬: শত্রু যখন বন্ধু চেনার লড়াই, আমাদের প্লেটের নীরব যুদ্ধ

৭ জুন ২০২৬ • Editing Section
৫৯৬ বার দেখা
শেয়ার করুন

| এস এম মেহেদী হাসান |

আজ ৬ জুন। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বালাইনাশক বা কীটপতঙ্গ সচেতনতা দিবস (World Pest Day)। ২০১৭ সালে চীনের বেইজিংয়ে আন্তর্জাতিক পেস্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দিবসটির যাত্রা শুরু হয়। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন নয়; বরং রোগবাহক ও খাদ্যবিনাশী বালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা।

প্রথম দর্শনে বিষয়টি হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একদিকে মশা, মাছি, ইঁদুর ও ফসলখেকো পোকামাকড় মানুষের জীবন ও অর্থনীতির জন্য হুমকি; অন্যদিকে মৌমাছি, প্রজাপতি, লেডিবাগ ও অসংখ্য উপকারী পোকা প্রকৃতির ভারসাম্য এবং খাদ্য উৎপাদনের নীরব যোদ্ধা। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: আমরা কি শত্রু পোকা মারতে গিয়ে বন্ধু পোকাদেরও নিশ্চিহ্ন করে ফেলছি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে বালাইয়ের প্রভাব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মশাবাহিত রোগের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হন। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস এবং ফাইলেরিয়ার মতো রোগ এখনও বহু দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বলছে, পোকামাকড়, রোগবালাই এবং ইঁদুরের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর অর্থ হলো, কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে গুদামঘর পর্যন্ত খাদ্য সুরক্ষার প্রতিটি ধাপে বালাই নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: মশা, ইঁদুর ও ফসলখেকো পোকার দাপট

বাংলাদেশে বর্তমানে ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এডিস মশার বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

গ্রামাঞ্চলেও সমস্যার শেষ নেই। ধান, সবজি, ভুট্টা, মরিচ ও ফলের বাগানে বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণে প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। খাদ্য গুদামে ইঁদুরের উপদ্রবে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট হয়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকা দমনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে এর পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায়।

কেমিক্যালের অন্ধ জোয়ার: শত্রু মারতে গিয়ে বন্ধুর মৃত্যুদণ্ড

ফসল রক্ষা ও অধিক ফলনের আশায় কৃষকরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন। একইভাবে নগর এলাকায় মশা দমনের নামে নির্বিচারে রাসায়নিক স্প্রে করা হয়।

এর ফলে সাময়িকভাবে ক্ষতিকর পোকা কমলেও একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় প্রকৃতির অসংখ্য উপকারী কীটপতঙ্গ।

মৌমাছি, প্রজাপতি, লেডিবাগ, বোলতা, ফড়িং এবং বিভিন্ন পরাগবাহী পোকা কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এটি শুধু জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নয়; বরং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।

মৌমাছি হারালে প্লেট খালি হবে

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ ফুলগাছ এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ খাদ্যশস্য সরাসরি পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল।

এই পরাগায়নের প্রধান দায়িত্ব পালন করে মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য উপকারী পোকামাকড়।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি মৌমাছির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়, তাহলে ফল, সবজি, বাদাম, তেলবীজ ও নানা ধরনের কৃষিপণ্যের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাবে।

অর্থাৎ আমরা শুধু একটি পোকা হারাব না; হারাব আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ।

বিষের বৃত্তে মানুষ ও প্রকৃতি: শীর্ষ কীটতত্ত্ববিদের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান বলেন,

“কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য কখনোই প্রকৃতির সব পোকা ধ্বংস করা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিকর পোকার অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনা। কিন্তু বর্তমানে আমরা যেভাবে নির্বিচারে রাসায়নিক ব্যবহার করছি, তাতে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য উপকারী পোকামাকড়ও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন,

“বর্তমানে শুধু কীটনাশক নয়, মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ, আলোক দূষণ এবং আবাসস্থল ধ্বংসও কীটপতঙ্গের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রকৃতির এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনও বড় সংকটে পড়বে।”

বিষের বাজার: কোটি টাকার ব্যবসা

বাংলাদেশে কীটনাশকের বাজার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার। বিভিন্ন বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানি হাজারো ব্র্যান্ডের কীটনাশক বাজারজাত করছে।

কৃষকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, বাজারে একই ধরনের পণ্যের ভিড়ে কার্যকর ও নিরাপদ কীটনাশক বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

একজন কৃষক জানান,

“আগে মৌসুমে এক-দুইবার স্প্রে করলেই হতো। এখন অনেক সময় পাঁচ-ছয়বারও করতে হয়। খরচ বাড়ছে, কিন্তু পোকাও পুরোপুরি কমছে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন একই রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে অনেক পোকা কীটনাশক-প্রতিরোধী (Pesticide Resistant) হয়ে উঠছে। ফলে কৃষককে আরও বেশি মাত্রায় ওষুধ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মানবদেহে বালাইনাশকের নীরব আক্রমণ

ফসলে ব্যবহৃত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শুধু মাঠে থাকে না। তা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে।

বৃষ্টির পানির মাধ্যমে এসব রাসায়নিক নদী, খাল-বিল এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। পরে মাছ, শাকসবজি, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমে আবার মানুষের শরীরে ফিরে আসে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন,

“বালাইনাশক ও কীটনাশকের বিষয়টি এখন শুধু কৃষি উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। খাদ্যের মাধ্যমে অল্পমাত্রায় হলেও যখন বছরের পর বছর রাসায়নিক মানবদেহে প্রবেশ করে, তখন তার প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।”

তিনি বলেন,

“দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক লিভার, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় কিছু কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা, প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতা এবং স্নায়বিক রোগের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।”

তার মতে, নির্ধারিত অপেক্ষাকাল না মেনে ফসল বাজারজাত করা এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন বালাইয়ের আগমন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন কীটপতঙ্গ ও রোগবালাইয়ের বিস্তার ঘটছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তন এবং ঋতুচক্রের অস্বাভাবিকতার কারণে অনেক পোকা আগের তুলনায় দ্রুত বংশবিস্তার করছে।

বাংলাদেশেও কৃষি গবেষকরা নতুন কিছু ক্ষতিকর পোকার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সমাধান কোথায়? সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM)

বিশেষজ্ঞদের মতে, বালাই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হলো Integrated Pest Management (IPM) বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা।

এর প্রধান উপাদানগুলো হলো:

জৈব বালাইনাশক ব্যবহার

নিম, মেহগনি, তামাক নির্যাসসহ পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার।

ফেরোমন ফাঁদ

ক্ষতিকর পোকা দমনে রাসায়নিকের পরিবর্তে ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার।

উপকারী পোকা সংরক্ষণ

মৌমাছি, প্রজাপতি, মাকড়সা, ব্যাঙ ও দেশীয় পাখি রক্ষা করা।

পরিচ্ছন্নতা

বাসাবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা।

কৃষক প্রশিক্ষণ

সঠিক মাত্রা ও সময় মেনে কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।

উপসংহার

বিশ্ব বালাইনাশক দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রকৃতির সব পোকাই শত্রু নয়। কিছু পোকা রোগ ছড়ায়, ফসল নষ্ট করে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি করে; আবার কিছু পোকা খাদ্য উৎপাদন, পরাগায়ন এবং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

তাই বালাই দমনের লড়াইটি কেবল পোকা মারার লড়াই নয়; এটি শত্রু ও বন্ধু চেনার লড়াই। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।

কারণ প্রকৃতি বাঁচলে উপকারী কীটপতঙ্গ বাঁচবে, উপকারী কীটপতঙ্গ বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই নিরাপদ থাকবে মানুষের প্রতিদিনের খাবারের প্লেট।

লেখক পরিচিতি:

এস এম মেহেদী হাসান, সদস্য, আহ্বায়ক কমিটি, বাংলাদেশ রিপোর্টার্স কাউন্সিল (বিআরসি) ই-মেইল: sm.mehedi.hasan1977@gmail.com

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন