শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৪৮ হাজার কমিটি, তবু মশা নিয়ন্ত্রণে এত অকার্যকরতা কেন?

৭ অক্টোবর ২০২৬ • Editing Section
৫৬৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সমস্যা নয়। শহর পেরিয়ে এডিস মশার বিস্তার এখন গ্রামেও। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, প্রতিদিনই আসছে মৃত্যুর খবর। এমন একটি সময়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—ডেঙ্গু মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি আসলে কতটা কার্যকর?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথম আলোর একটি বিশেষ প্রতিবেদন বেশ অস্বস্তিকর একটি চিত্র সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মশা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটি থাকার কথা। কিন্তু বিপুল এই সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশের কার্যক্রম মাঠে দৃশ্যমান নয়।

এখানেই মূল প্রশ্নটি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যদি এত কমিটি থাকার কথা থাকে, তাহলে মশা নিয়ন্ত্রণে বাস্তব অগ্রগতি কোথায়?

কমিটি গঠন করা প্রশাসনিক কাজের প্রথম ধাপ হতে পারে, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। একটি কমিটি তখনই কার্যকর, যখন তার নিয়মিত সভা হয়, দায়িত্ব ভাগ করা থাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা কেউ অনুসরণ করে। শুধু তালিকায় একটি কমিটির নাম থাকা কিংবা একটি নির্দেশিকায় তার দায়িত্ব লেখা থাকলে জনস্বাস্থ্যের সংকট মোকাবিলা করা যায় না।

কাগজের কাঠামো বনাম মাঠের বাস্তবতা

২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে একটি জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করেছিল। সেখানে ইউনিয়নের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জাতীয় পর্যায়ে কমিটির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কমিটির সভা, দায়িত্ব এবং করণীয়ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্রের কাছে নীতিগত কাঠামোর অভাব নেই। সমস্যা যদি থেকে থাকে, সেটি বাস্তবায়নে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন এলাকার যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে কোথাও কমিটি নেই, কোথাও কমিটি থাকলেও সভা হয়নি, আবার কোথাও কমিটির বাইরে স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিরা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধনের কাজ করছেন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—কমিটি না থাকলেও যদি কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ হয়, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানও জানে না কমিটি আছে কি না, কমিটি থাকলেও তার কাজ কী, আর কোথাও কাজ চললেও তার ধারাবাহিকতা নেই।

জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে এমন বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক চিত্র হতে পারে না।

দায়িত্ব কার, জবাবদিহি কার?

ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা, লার্ভার উৎস ধ্বংস, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়—সবকিছুর সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামো সরাসরি যুক্ত।

তাহলে প্রশ্ন হলো, একটি এলাকায় ডেঙ্গু বাড়লে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি বা প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞেস করার ব্যবস্থা কোথায়?

ধরা যাক, কোনো ইউনিয়নে মাসের পর মাস মশার বংশবিস্তারের জায়গা পরিষ্কার হলো না। সেখানে যদি ডেঙ্গু বাড়ে, তাহলে দায় নেবে কে? ইউনিয়ন পরিষদ? উপজেলা প্রশাসন? স্থানীয় সরকার বিভাগ? নাকি বিষয়টি শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে?

ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসা দেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা স্বাস্থ্য বিভাগের একার কাজ নয়। রোগী হাসপাতালে যাওয়ার আগেই প্রতিরোধের বড় অংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা।

এই জায়গাতেই সমন্বয়ের প্রয়োজন।

রোগী বাড়লে হাসপাতাল বাড়ানো সমাধান নয়

ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে আমরা প্রায়ই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, ওষুধ কিংবা পরীক্ষার সুবিধা নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সামনে রাখা দরকার—প্রতি বছর যদি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থা বাড়িয়ে কতদিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব?

জনস্বাস্থ্যের মূল দর্শনই হলো রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

একটি এডিস মশা কোথায় জন্ম নিচ্ছে, কোন এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব বেশি, কোন জায়গায় পানি জমে আছে, কোন নির্মাণাধীন ভবন বা পরিত্যক্ত স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ—এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার কথা। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

কিন্তু যদি কোনো এলাকায় মশার ঘনত্ব বাড়ার পরও প্রশাসনের নড়াচড়া শুরু হয়, তাহলে সেটিকে প্রতিরোধ বলা যায় না; সেটি প্রতিক্রিয়া।

গ্রামে ডেঙ্গু, কিন্তু প্রস্তুতি কি গ্রামেও?

ডেঙ্গুর বিস্তার শহর থেকে গ্রামে চলে যাওয়াটা এবার নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গুকে মূলত নগরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণের বড় পরিকল্পনাগুলোও শহরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে।

গ্রামের বাড়িঘর, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সব জায়গাতেই এখন এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অথচ গ্রামের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে যদি কার্যকর কাঠামোই না থাকে, তাহলে শহরের বাইরে ডেঙ্গু মোকাবিলা হবে কীভাবে?

এ কারণেই ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড পর্যায়ের ভূমিকা নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

৪৮ হাজার কমিটি কি তাহলে নতুন করে ভাবতে হবে?

এখানে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আরও কমিটি দরকার, নাকি বিদ্যমান কমিটিগুলোকে কার্যকর করা দরকার?

আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টিই বেশি জরুরি।

নতুন করে আরও কমিটি গঠন করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং কোন কমিটি কোথায় আছে, তার সদস্য কারা, শেষ কবে সভা হয়েছে, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্য করা দরকার।

প্রয়োজনে প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নের জন্য ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি সহজ কর্মপরিকল্পনা থাকতে পারে। মাসে কতটি এলাকা পরিদর্শন হয়েছে, কতটি লার্ভার উৎস ধ্বংস করা হয়েছে, কতটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হয়েছে, কতটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়েছে—এসবের হিসাব রাখা যেতে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এ কাজ সহজ করা সম্ভব। কোথায় মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেল, কোথায় ব্যবস্থা নেওয়া হলো, কোথায় আবার পরিদর্শন দরকার—এসব তথ্য একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা গেলে সাধারণ মানুষও দেখতে পারবে স্থানীয় প্রশাসন কী করছে।

তখন কমিটি শুধু কাগজের একটি নাম থাকবে না; তার কাজের হিসাবও থাকবে।

নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায় বেশি

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, ফুলের টব, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র বা পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমতে না দেওয়া—এসব সচেতনতার বিষয়।

কিন্তু নাগরিক সচেতনতার ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না।

একজন নাগরিক নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করলেন, কিন্তু পাশের খালি জায়গায় মাসের পর মাস পানি জমে আছে। পাশের নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। ড্রেন বন্ধ হয়ে আছে। তখন শুধু নাগরিককে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তির সচেতনতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও কার্যকরভাবে পালিত হবে।

এখন দরকার কমিটির হিসাব

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেছেন, এসব কমিটি সচল করা জরুরি এবং মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটিগুলো সক্রিয় করা গেলে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।

এই বক্তব্যের সঙ্গে মূলত দ্বিমত করার সুযোগ নেই। তবে এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যোগ করা দরকার—কমিটি সক্রিয় করার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কত কমিটি আছে, সেটি বড় কথা নয়। কতগুলো কাজ করছে, সেটিই আসল।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের লড়াই কেবল ফগার মেশিন চালানো বা মশার ওষুধ ছিটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটি হতে হবে বছরব্যাপী একটি সমন্বিত কার্যক্রম। মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা, নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া—সবকিছুকে একই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

৪৮ হাজারের বেশি কমিটি যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তাদের কাজে নামার সময় এখনই। আর যদি কাগজের বাইরে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই কাগজের কাঠামোকে বাস্তব ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর একজন নাগরিকের কাছে কমিটির সংখ্যা কোনো অর্থ বহন করে না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তার বাড়ির পাশের জমে থাকা পানিটুকু সময়মতো পরিষ্কার হলো কি না, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস হলো কি না এবং প্রশাসন প্রয়োজনের সময় সেখানে পৌঁছাল কি না।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সাফল্য মাপা হবে সভার সংখ্যা দিয়ে নয়, মশার প্রজননস্থল কতটা কমল এবং মানুষের মৃত্যু কতটা ঠেকানো গেল—সেই হিসাব দিয়ে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন