এম এ রহিম: লন্ডনে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক পথিকৃৎ
রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী
১৯৯০ সালে প্রথম যখন লন্ডনে আসি, তখন পূর্ব লন্ডনের ব্র্যাডি স্ট্রিটে বসবাস শুরু করি। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই ছিল অচেনা। কিন্তু এই অচেনা শহরের মধ্যে একদিন ব্রিক লেনে বাংলা অক্ষর দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। লন্ডনের বুকে বাংলা ভাষার উপস্থিতি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
সেই বাংলা অক্ষরের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ যেন আমার কাছেই আছে। প্রবাসে এসে মানুষ নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির মূল্য নতুন করে বুঝতে শেখে। একটি বাংলা শব্দ, একটি সাইনবোর্ড কিংবা পরিচিত কোনো নামও তখন দেশের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
বহু বছর পর বুঝতে পেরেছি, ব্রিক লেনের বাংলা শুধু কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের শ্রম, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং নিজের ভাষা ও পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এম এ রহিমের নাম।
এম এ রহিম একসময় ব্রিটিশ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পূর্ব লন্ডনের বাঙালি সমাজের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি কাজ করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বের পথ তৈরি হওয়ার সময় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯০ সালের দিকে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় ছিল। রহিম সেই দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় দৃশ্যমান করার উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিক লেনের বাংলা সাইনবোর্ডের মতো উদ্যোগের পেছনে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান শুধু স্থানীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব উদ্যোগ প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাঙালিদের নিজেদের ভাষা ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে।
আমার কাছে ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষর তাই শুধু একটি সাইনবোর্ড নয়। এটি এমন এক সময়ের স্মৃতি, যখন প্রবাসের মাটিতে নিজের ভাষার পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
প্রবাসে বসবাসকারী মানুষ জানেন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা কতটা জরুরি। বাইরে থেকে প্রবাসীদের জীবন স্বচ্ছল মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁদের মনের মধ্যে দেশের জন্য এক ধরনের টান সব সময় কাজ করে।
বাংলা ভাষা সেই টানের একটি বড় অংশ। ঘরে বাংলা বলা, পরিবারের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলা কিংবা রাস্তায় বাংলা লেখা দেখতে পাওয়া—এসবের মধ্য দিয়ে প্রবাসীরা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
লন্ডনে বাংলা ভাষার উপস্থিতি আজ অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থার পেছনে আগের প্রজন্মের মানুষের শ্রম ও উদ্যোগ রয়েছে। তাঁরা স্থানীয় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন, নিজেদের অধিকারের কথা বলেছেন এবং বাঙালিদের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন।
এম এ রহিমের রাজনৈতিক পথচলাকে সেই ইতিহাসের অংশ হিসেবেই আমি দেখি। তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পরে এম এ রহিম বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেন। মৌলভীবাজার থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
এরপর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। তাঁর জীবনের এই পথচলা আমাকে ভাবায়। একজন মানুষ জীবনের কতটা সময় রাজনীতি ও স্বপ্নের পেছনে ব্যয় করেন, কত আশা নিয়ে সামনে এগিয়ে যান, আবার একসময় পুরোনো শহরে ফিরে আসেন।
লন্ডনে ফিরে এসে রহিম হয়তো সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবেন। পরিচিত রাস্তা, পুরোনো স্মৃতি আর রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই তাঁর মনে ফিরে আসে। ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষরগুলোও হয়তো তাঁকে সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
রাজনীতিতে সাফল্য সব সময় পদ বা ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের কাজ সমাজে কতটা প্রভাব ফেলেছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে গেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অনেক সময় যাঁরা সমাজের জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান যথাসময়ে মূল্যায়ন করি না। সময়ের সঙ্গে তাঁদের নাম ও কাজ আড়ালে চলে যায়। নতুন প্রজন্মও তাঁদের সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় না।
কিন্তু নিজেদের ইতিহাস ধরে রাখতে হলে এই মানুষগুলোর কাজের কথা তুলে ধরতে হবে। লন্ডনে বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
আমার বিশ্বাস, এম এ রহিমের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত। তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হলে প্রবাসে বাংলা ভাষা ও বাঙালির পরিচয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও আরও স্পষ্ট হবে।
একুশে পদক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজ শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরেও যাঁরা বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান আমাদের ইতিহাসের অংশ।
সেই বিবেচনা থেকেই আমার দাবি, বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং ব্রিটেনের বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় এম এ রহিমের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হোক। তাঁকে একুশে পদকের জন্য বিবেচনা করা হোক।
এই দাবি তাঁর কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রবাসে বাংলা ভাষার পরিচয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে সম্মান জানানোরও দাবি।
ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষরগুলো আমাকে আজও সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, নিজের ভাষাকে অন্য একটি দেশের মাটিতে পরিচিত করে তোলার পেছনেও মানুষের দীর্ঘ প্রচেষ্টা থাকে।
মানুষ একদিন চলে যায়, রাজনীতির পথও বদলে যায়। কিন্তু মানুষের কাজ ও অবদান থেকে যায়। এম এ রহিমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা, তাঁর কাজের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা তাই জরুরি।
লন্ডনের কুয়াশার মধ্যে ব্রিক লেনের বাংলা অক্ষরগুলো শুধু একটি ভাষার পরিচয় বহন করে না; এগুলো প্রবাসে বাঙালির অধিকার, আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের কথাও মনে করিয়ে দেয়। সেই ইতিহাসে এম এ রহিমের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হোক।
মূল লেখাকে সম্পাদনা করা হয়েছে, সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুযায়ী