শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬০৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পুলিশের পৃথক অভিযানে ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আনা চারটি ষাড় বাছুর ও ৪০ লিটার দেশীয় তৈরি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে শ্রীমঙ্গলে চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন মিল্টন সরকার (৪৯) নামে এক ব্যক্তি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ২৮টি চুরি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর বড়লেখা হাজীগঞ্জ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতীয় গরুগুলো উদ্ধার করে থানা পুলিশ। একই রাতে দক্ষিণভাগ গুলিস্তান এলাকায় একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে ৪০ লিটার দেশীয় তৈরি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মদ পরিবহনে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে।

এর পরদিন ১৫ সেপ্টেম্বর ভোরে শ্রীমঙ্গল-হবিগঞ্জ মহাসড়কে চেকপোস্ট পরিচালনার সময় নাম্বার প্লেটবিহীন একটি ইয়ামাহা ১৫৫ সিসি মোটরসাইকেলসহ মিল্টন সরকারকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেলটির কোনো বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। জব্দ করা মোটরসাইকেলটির আনুমানিক মূল্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

এক দিনের ব্যবধানে এসব অভিযান আবারও সামনে নিয়ে এসেছে মৌলভীবাজারের সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশের বিষয়টি। সীমান্তের ওপারে ভারত, এপারে বাংলাদেশ। মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও সীমান্ত দিয়ে নানা ধরনের ভারতীয় পণ্য ঢোকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গরু, মদ, বিড়ি, সিগারেট ও প্রসাধনী থেকে শুরু করে মাদকদ্রব্যও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসছে বলে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।

মৌলভীবাজার সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানকার চোরাচালান শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য ও মাদক প্রবেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও। তাই প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তে এত নজরদারির পরও কীভাবে এসব পণ্য দেশের ভেতরে ঢুকে পড়ছে এবং কারা এর পেছনে কাজ করছে?

সীমান্ত দিয়ে আসছে নানা পণ্য

মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ভারতের সীমান্তঘেঁষা। কোথাও পাহাড়-টিলা, কোথাও বনাঞ্চল, চা-বাগান কিংবা দুর্গম জনপদ। সীমান্তের এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ছোট ছোট চালানে এপারে আনার চেষ্টা করা হয়। ভারতীয় নাসিরউদ্দিন বিড়ি, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট, প্রসাধনী, মদসহ নানা পণ্য স্থানীয় বাজারে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। সময় সময় এসব পণ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটকও হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় মাদক। নকল বা অবৈধ ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ সীমান্তপথে দেশে ঢোকার ঝুঁকি রয়েছে। সীমান্তে একটি চালান আটক হলেও এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক ধরা পড়ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কীভাবে থামবে চোরাচালান

সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার নির্দিষ্ট কৌশল বা গোপন পথ প্রকাশ করা নিরাপত্তার দিক থেকে সমীচীন নয়। তবে চোরাচালান বন্ধে কোন এলাকায় এ ধরনের তৎপরতা বেশি, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং পণ্য দেশের ভেতরে কার কাছে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

একটি চালান আটক করার পর শুধু বহনকারীকে গ্রেপ্তার করলেই চোরাচালান বন্ধ হবে না। সীমান্তের ওপারের সরবরাহকারী, বাংলাদেশের স্থানীয় সহযোগী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী ও ক্রেতাদের শনাক্ত করতে হবে। চোরাচালানের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পারলে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসায় বড় ধাক্কা দেওয়া সম্ভব।

স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে

সীমান্তের প্রতিটি এলাকায় সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন। তাই স্থানীয় মানুষকে সীমান্ত সুরক্ষার অংশীদার করা জরুরি।

জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা, চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কোন এলাকায় সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে, কারা অস্বাভাবিকভাবে পণ্য পরিবহন করছে কিংবা কারা মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত, এসব তথ্য যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারে।

তবে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

নজরদারি বাড়াতে হবে মাদক কারবারিদের ওপর

মাদক কারবারিদের গতিবিধির ওপর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। সীমান্তে মাদক আটক হওয়ার পর এর উৎস কোথায়, কে বহন করেছে এবং কোথায় পৌঁছানোর কথা ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বারবার মাদক বা চোরাচালানের অভিযোগ পাওয়া গেলে তার কার্যক্রম ও যোগাযোগ আইনানুগভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।

বিজিবি, পুলিশ, ডিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমস ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোও জরুরি। সীমান্তে আটক হওয়া পণ্য ও ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত চোরাচালান চক্র শনাক্ত করা গেলে অভিযান আরও কার্যকর হবে।

মৌলভীবাজারের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পণ্য ও মাদক প্রবেশ বন্ধে তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরে চোরাচালান নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান একসঙ্গে চললেই এই অবৈধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন