শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

ক্ষমতার দিন শেষ হয়, হিসাবের দিন শেষ হয় না

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • Editing Section
৬২৫ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

একসময় যাঁদের একটি কথায় প্রশাসন নড়ত, যাঁদের রাজনৈতিক নির্দেশকে অমান্য করার সাহস ছিল না অনেকের, আজ তাঁরাই বিচারের কাঠগড়ায়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধ হয় এটাই: ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ক্ষমতায় করা কাজের হিসাব একদিন না একদিন দিতেই হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। শুধু মৃত্যুদণ্ড নয়, পাঁচ আসামির সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সম্পদ জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রায়ের এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরাধের বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভুক্তভোগীর ক্ষত পূরণ হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোও ন্যায়বিচারের অংশীদার। তাই বাজেয়াপ্ত সম্পদ ক্ষতিপূরণে ব্যবহারের নির্দেশটি জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামির সবাই পলাতক।

রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে শেখ ফজলে শামস পরশ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। ফলে তাঁর নির্বাচনী হলফনামা পাওয়া যায়নি। অন্য চারজনের সম্পদের হিসাব ২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামা থেকে জানা যায়।

কাদেরের প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ আসনের প্রার্থী হিসেবে ওবায়দুল কাদের যে হলফনামা দিয়েছিলেন, তাতে হাতে নগদ দেখিয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ছিল প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্র ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকার। একটি গাড়ির দাম দেখানো হয়েছিল ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

২৫ তোলা সোনার মূল্য দেখানো হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং আসবাব ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকার উত্তরায় ৫ কাঠা জমি, যার মূল্য প্রায় ৫১ লাখ টাকা।

হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

নাছিমের সম্পদ প্রায় ৩৫ কোটি

ওবায়দুল কাদেরের তুলনায় আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে অংশ নেওয়া নাছিমের হাতে নগদ ছিল ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ব্যাংকে ছিল ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ার ও বন্ডের মূল্য ছিল ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

সঞ্চয়পত্র ৬০ লাখ টাকা, দুটি গাড়ি প্রায় ৬৫ লাখ টাকা এবং ২৫ ভরি সোনার মূল্য সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। ইলেকট্রনিকস ও আসবাবের মূল্য ছিল সোয়া ১০ লাখ টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

স্থাবর সম্পদের মধ্যে মাদারীপুর ও সাভারে ১৩৯ শতাংশ কৃষিজমি এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাজীপুরে ১৫৩ শতাংশ অকৃষিজমি ছিল। এসব জমির মূল্য ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল।

উত্তরায় একটি ভবনের মূল্য ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা।

স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ঘোষিত সম্পদের মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

আরাফাতের সম্পদ প্রায় ৪ কোটি ৬৯ লাখ

মোহাম্মদ আলী আরাফাত ঢাকা-১৭ আসন থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন এবং পরে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

গুলশান-২ এলাকায় তাঁর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল, যার মূল্য হলফনামায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল।

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নয়টি কোম্পানির শেয়ার ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার। সঞ্চয়পত্র ৩৪ লাখ টাকা, গাড়ি ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ৩ লাখ টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট প্রায় ৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

নিখিলের সম্পদে জমি, এফডিআর ও গাড়ি

ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল কৃষি ও অকৃষিজমি।

একটি কৃষিজমি প্রায় সাড়ে ৬ একর, যার মূল্য ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আরেকটি কৃষিজমি ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যার মূল্য ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

তিন কাঠার অকৃষি প্লটের মূল্য ৪ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা এবং বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট শ্রেণিতে ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ টাকার সম্পদ ছিল।

স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৬৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ ছিল ২৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। নিজের নামে ১ কোটি টাকার এফডিআর ছিল। নাবিল প্রপার্টিজে ৮ লাখ টাকা এবং নাবিল প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ে ৬২ লাখ টাকার শেয়ার ছিল।

তিনটি যানবাহনের মূল্য দেখানো হয়েছিল ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। ইলেকট্রনিকস ও আসবাবের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।

সম্পদের হিসাব, কিন্তু আরও বড় হলো জবাবদিহির প্রশ্ন

এই সম্পদের পরিমাণ দেখেই কারও অপরাধ প্রমাণ হয়ে যায় না। নির্বাচনী হলফনামায় ঘোষিত সম্পদ আর সম্পদের বৈধতা বা অবৈধতার প্রশ্ন এক নয়। সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়ার।

তবে রায়ের পর সম্পদের হিসাব সামনে আসার কারণও স্পষ্ট। আদালত যখন পাঁচ আসামির সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন সম্পদও বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশও দেওয়া হয়। জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা

এই রায়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই: রাষ্ট্রক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকবচ নয়।

আজ যে ক্ষমতাবান, কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে। আজ যে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, কাল সেই সিদ্ধান্তের জন্য তাকেই জবাব দিতে হতে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব নেই।

তাই এই রায় শুধু অতীতের বিচার নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। আগামী দিনে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, যে দলেরই হোক, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের জীবন ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত। কিন্তু অপরাধের দায়ের মেয়াদ মানুষের স্মৃতিতে অনেক দীর্ঘ।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার আসল সৌন্দর্য ক্ষমতায় থাকা নয়, ক্ষমতা থাকার পরও আইনের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকা। আর একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় হলো, সেখানে অপরাধী কতটা ক্ষমতাবান ছিলেন তা নয়, তাঁর বিরুদ্ধে আইন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে।

জুলাইয়ের এই রায় সেই পরীক্ষারই একটি অধ্যায়।

ক্ষমতা চলে যায়। পদ চলে যায়। রাজনৈতিক প্রভাবও একদিন শেষ হয়। কিন্তু মানুষের রক্তের হিসাব, ভুক্তভোগীর কান্না এবং আইনের বিচার সহজে শেষ হয় না।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের ক্ষমতাবানদের কাছে তাই একটি বার্তা পরিষ্কার: ক্ষমতার চেয়ার সাময়িক, কিন্তু কাজের জবাবদিহি অনিবার্য।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদিক

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন