ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার ছয় দশকের গল্প: NGFFL থেকে শাহজালাল ফার্টিলাইজার
এস এম মেহেদী হাসান
সুরমা নদীর তীরে ফেঞ্চুগঞ্জ। চারদিকে হাওর, সবুজ আর নদীর বাতাস। এই শান্ত জনপদের বুকেই ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। দূর থেকে দেখা যায় বিশাল শিল্পকাঠামো, চিমনি, পাইপলাইন আর আধুনিক প্ল্যান্ট। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে আছে বহু মানুষের জীবন, শ্রম, স্বপ্ন ও স্মৃতির দীর্ঘ গল্প।
একসময় যার নাম ছিল ন্যাচারাল গ্যাস ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (NGFFL), সময়ের সঙ্গে সেই পুরোনো কারখানার জায়গা নিয়েছে আধুনিক শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (SFCL)।
এটি শুধু একটি কারখানার নাম বদলের গল্প নয়। এটি একটি জনপদের বদলে যাওয়ার গল্প। এটি বাংলাদেশের কৃষি, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের গল্প। একই সঙ্গে এটি সেইসব মানুষের গল্প, যাদের ঘাম ও শ্রমে বছরের পর বছর সচল থেকেছে এই বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
গল্পটা ষাটের দশকের শুরুতে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছিল। অন্যদিকে সিলেটের হরিপুরে আবিষ্কৃত হয়েছিল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত।
প্রাকৃতিক গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সার উৎপাদনের চিন্তা থেকেই ফেঞ্চুগঞ্জে গড়ে ওঠে ন্যাচারাল গ্যাস ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি। ১৯৬১ সালে এর যাত্রার সূচনা এবং ১৯৬২ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।
তখনকার ফেঞ্চুগঞ্জ আজকের মতো ছিল না। চারপাশে ছিল গ্রাম, নদী আর হাওরের জীবন। সেই জনপদের পাশে হঠাৎ বিশাল একটি শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা ছিল যেন অন্য এক পৃথিবীর আগমন।
কারখানার সাইরেন ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গেল। সকালে সাইরেন বাজলে কর্মীদের কর্মস্থলে যাওয়ার সময় হতো। রাতের অন্ধকারে কারখানার আলো দূর থেকেও দেখা যেত।
একটি শিল্পকারখানা কীভাবে একটি জনপদের জীবন বদলে দিতে পারে, ফেঞ্চুগঞ্জ তার জীবন্ত উদাহরণ।
একটি বড় কারখানা কখনো শুধু তার সীমানার মধ্যে থাকে না। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ফার্টিলাইজার কলোনি। আবাসিক ভবন, স্কুল, খেলার মাঠ, ক্লাব, সাংস্কৃতিক আয়োজন, বাজারসহ ধীরে ধীরে তৈরি হয় একটি স্বতন্ত্র সামাজিক পরিবেশ।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ চাকরি করতে এলেন। সঙ্গে এল তাদের পরিবার। একসময় এই কলোনিই হয়ে উঠল একটি বড় পরিবারের মতো।
কারও সন্তান এখানে স্কুলে পড়েছে, কেউ এই মাঠে খেলতে খেলতে বড় হয়েছে। ঈদে একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা কিংবা অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, সব মিলিয়ে কারখানাটি ফেঞ্চুগঞ্জের মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।
আজও প্রবীণদের মুখে সেই সময়ের গল্প শোনা যায়। তাদের কাছে NGFFL শুধু একটি কারখানার নাম নয়, জীবনের একটি সময়ের নাম।
এই কারখানার সবচেয়ে বড় পরিচয় দেশের কৃষির সঙ্গে এর সম্পর্ক।
ইউরিয়া সার বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে এর ব্যবহার রয়েছে। দেশের সার চাহিদা পূরণে ফেঞ্চুগঞ্জের কারখানাও বছরের পর বছর অবদান রেখেছে।
বিশেষ করে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল কঠিন। যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতি ও কৃষিকে ঘুরে দাঁড় করানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ছিল জরুরি। আর সেই কাজে সার ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
কারখানার ভেতরে তখন দিন-রাত চলত কর্মযজ্ঞ। প্রকৌশলী, মেকানিক, অপারেটর, শ্রমিক, পরিবহনকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাদের অনেকের নাম হয়তো কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু তাদের শ্রমের ফল পৌঁছেছে দেশের নানা প্রান্তের কৃষকের কাছে।
এক অর্থে ফেঞ্চুগঞ্জের কারখানার সাইরেনের শব্দের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষকের মাঠের সবুজেরও একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সময় থেমে থাকে না। মানুষের মতো যন্ত্রেরও বয়স হয়।
দীর্ঘ কয়েক দশক চলার পর পুরোনো কারখানার যন্ত্রপাতিতে দেখা দিতে থাকে নানা সমস্যা। রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বাড়ে, উৎপাদন দক্ষতা কমে এবং জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পুরোনো প্রযুক্তি হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল।
একসময় যে প্রযুক্তি ছিল আধুনিকতার প্রতীক, সময়ের পরিবর্তনে সেটিই হয়ে দাঁড়ায় সীমাবদ্ধতা।
কারখানাটির পুরোনো অবকাঠামো ধীরে ধীরে তার সক্ষমতা হারাতে থাকে। উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এটি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, ফেঞ্চুগঞ্জের মানুষের জন্যও ছিল আবেগের সময়। কারণ কারখানাটি তাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
যে সাইরেন শুনে একটি প্রজন্মের সকাল শুরু হয়েছিল, সেই কারখানার কার্যক্রম একদিন থেমে যাওয়ার দৃশ্য নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
কিন্তু সেই বিদায়ের মধ্যেই শুরু হয়েছিল নতুন একটি অধ্যায়।
আধুনিক প্রযুক্তি ও বেশি উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে নতুন একটি সার কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার।
২০১২ সালে নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতায় কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় নতুন কারখানা। ২০১৫ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (SFCL)।
পুরোনো ও নতুন কারখানার মধ্যে পার্থক্য শুধু ভবনের চেহারায় নয়। উৎপাদনক্ষমতা ও প্রযুক্তিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন।
SFCL-এর দৈনিক প্রায় ১,৭৬০ মেট্রিক টন গ্র্যানুলার ইউরিয়া এবং ১,০০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
আধুনিক ডিজিটাল কন্ট্রোল সিস্টেমের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পরিবেশ ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।
অর্থাৎ ফেঞ্চুগঞ্জে একটি কারখানা শুধু বন্ধ হয়নি, পুরোনো প্রযুক্তির জায়গায় নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আমরা যখন একটি কারখানার কথা বলি, তখন সাধারণত উৎপাদনের হিসাব করি। কত টন সার উৎপাদন হলো, কত টাকা বিনিয়োগ হলো, কত গ্যাস ব্যবহার হলো, এসবই সামনে আসে।
কিন্তু সেই উৎপাদনের পেছনে থাকা মানুষগুলোর কথা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
একটি আধুনিক সার কারখানা চালাতে কেমিক্যাল বা প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, ইনস্ট্রুমেন্টেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহন বিভাগের মানুষের প্রয়োজন হয়।
বিশেষ করে পরিবহন বিভাগের দায়িত্বও কম নয়। ট্রাক, ফর্কলিফট, পে-লোডার, ক্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহন ও যন্ত্রপাতি সচল রাখতে হয়। উৎপাদিত সার গুদামে নেওয়া, স্থানান্তর করা এবং সরবরাহের কাজেও এসবের প্রয়োজন রয়েছে।
কোনো গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন বা যন্ত্রপাতি হঠাৎ অচল হলে তার প্রভাব পুরো ব্যবস্থায় পড়তে পারে।
তাই কারখানার সামনে যে বিশাল প্রযুক্তি দেখা যায়, তার পেছনে থাকা দক্ষ মানুষগুলোও এই শিল্পের নীরব নায়ক।
ফেঞ্চুগঞ্জের পুরোনো সার কারখানার সঙ্গে যে আবেগ জড়িয়ে আছে, সেটি সংরক্ষণ করা দরকার।
পুরোনো ছবি, নথি, যন্ত্রপাতি, কারখানার ইতিহাস এবং সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মৃতিচারণা সংগ্রহ করে একটি ছোট শিল্পঐতিহ্য জাদুঘর বা আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে।
এটি শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ নয়। নতুন প্রজন্মকে জানানোও জরুরি যে আজকের আধুনিক শিল্পব্যবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে বহু দশকের অভিজ্ঞতা, শ্রম এবং ত্যাগ।
উন্নয়ন মানে শুধু নতুন কিছু তৈরি করা নয়। পুরোনো অর্জনকে মনে রাখাও উন্নয়নের অংশ।
SFCL আজ আধুনিক প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনেক।
তবে সামনে চ্যালেঞ্জও আছে। জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখা, সবকিছুর দিকে নজর দিতে হবে।
একই সঙ্গে কৃষিতেও পরিবর্তন আসছে। শুধু বেশি সার উৎপাদন করলেই হবে না। কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছানো এবং সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার গল্প আসলে একটি দেশের পরিবর্তনের গল্প।
ষাটের দশকে প্রাকৃতিক গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে যে শিল্পযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কয়েক দশক ধরে দেশের কৃষিতে অবদান রেখেছে। পুরোনো প্রযুক্তি একসময় বিদায় নিয়েছে। তার জায়গায় এসেছে আধুনিক SFCL।
চেহারা বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। মানুষের প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু দেশের কৃষির জন্য সার উৎপাদনের প্রয়োজন এবং মানুষের শ্রমের গুরুত্ব বদলায়নি।
আজ ফেঞ্চুগঞ্জে দাঁড়ালে তাই একই সঙ্গে দুটি সময়কে দেখা যায়। একদিকে পুরোনো কারখানার স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন কারখানার ভবিষ্যৎ।
প্রবীণদের কাছে পুরোনো সাইরেন এখনও স্মৃতির শব্দ। নতুন প্রজন্মের কাছে আধুনিক প্ল্যান্ট নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
এই দুই সময়কে একসঙ্গে দেখাই হয়তো ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার সবচেয়ে বড় গল্প।
কারণ ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যৎ তৈরি হয়।
সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই কারখানা তাই শুধু ইট, লোহা আর যন্ত্রের সমষ্টি নয়। এটি হাজারো মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। আর সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এক শিল্পগাথা।
পুরোনো সাইরেনের শব্দ হয়তো আজ আর শোনা যায় না। কিন্তু তার স্মৃতি রয়ে গেছে। নতুন কারখানার যন্ত্রের শব্দ সেই স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়েই যেন বলে যাচ্ছে, সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু একটি জনপদের স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না।
ফেঞ্চুগঞ্জের গল্প তাই শেষ হয়নি। এটি শুধু নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক