শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

সৈয়দ মুজতবা আলী: মৌলভীবাজারের শিকড় থেকে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায়

২৬ আগস্ট ২০২৬ • Editing Section
৬১৬ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের লেখা পড়লে শুধু সাহিত্য পড়া হয় না, একই সঙ্গে পৃথিবীকে দেখার একটি নতুন চোখ তৈরি হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী তেমনই একজন লেখক। তাঁর লেখায় আছে ভ্রমণ, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন, গভীর জ্ঞান এবং অসাধারণ হাস্যরস।

তিনি ছিলেন একই সঙ্গে সাহিত্যিক, শিক্ষক, ভাষাবিদ, ভ্রমণকারী এবং একজন বিশ্বমনস্ক মানুষ। বাংলা সাহিত্যে রম্যরচনা ও ভ্রমণসাহিত্যের যে স্বতন্ত্র ধারা তিনি তৈরি করেছেন, তার তুলনা খুব বেশি নেই।

তবে তাঁর বিশ্বজোড়া পরিচয়ের পাশাপাশি একটি বিষয় আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৌলভীবাজারের মাটি। সেই কারণে সৈয়দ মুজতবা আলী শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন বড় লেখক নন, তিনি আমাদের এই অঞ্চলেরও গর্বের মানুষ।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার করিমগঞ্জে।

তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। তিনি সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মসূত্রে পরিবারের বসবাস বিভিন্ন জায়গায় হলেও সৈয়দ মুজতবা আলীর পারিবারিক শিকড় ছিল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে।

তাঁর পৈতৃক ভিটা মৌলভীবাজার সদর উপজেলার দুর্লভপুর গ্রামে। আবার তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল এলাকারও সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তাঁর শিকড়কে শুধু একটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের অংশ হিসেবেও দেখা যায়।

এই অঞ্চলই ছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোরের সাংস্কৃতিক গঠনের অন্যতম পটভূমি।

বাল্যকাল ও বেড়ে ওঠা

সৈয়দ মুজতবা আলীর শৈশব কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। সিলেট ও এর আশপাশের অঞ্চল ছিল ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও নানা ঐতিহ্যের মিলনভূমি।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞান ও নতুন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী জীবনে পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে বেড়ালেও তাঁর লেখায় বাংলার মানুষ, প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান বারবার ফিরে এসেছে।

এই কারণেই তাঁর বিশ্বদৃষ্টিকে শিকড়হীন বিশ্বদৃষ্টি বলা যায় না। বরং তিনি নিজের শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই পৃথিবীকে দেখেছেন।

শান্তিনিকেতনে শিক্ষা

তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীতে পড়াশোনার মাধ্যমে।

শান্তিনিকেতনের পরিবেশ তাঁর চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলে। সেখানে তিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি, বিভিন্ন ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার ধারণা এবং শান্তিনিকেতনের উদার সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর পরবর্তী চিন্তা ও লেখায় প্রভাব ফেলেছিল বলে সাহিত্যসমালোচকেরা মনে করেন।

শান্তিনিকেতন তাঁকে কেবল একজন ছাত্র হিসেবে তৈরি করেনি, তাঁকে একটি বড় পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছিল।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা

শিক্ষাজীবনের পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবন আরও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। তিনি আফগানিস্তানে যান এবং পরে ইউরোপে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

জার্মানির বার্লিন ও বন তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, ফরাসি, জার্মানসহ একাধিক ভাষায় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর এই জ্ঞান পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখাকে সমৃদ্ধ করে।

তাঁর লেখায় তাই একসঙ্গে পাওয়া যায় বাংলা মাটির গন্ধ, ভারতীয় সংস্কৃতি, ইসলামি সভ্যতার পরিচয় এবং ইউরোপীয় চিন্তার ছাপ।

শিক্ষকতা ও কর্মজীবন

সৈয়দ মুজতবা আলীর কর্মজীবনও ছিল বিচিত্র।

তিনি শিক্ষকতা করেছেন ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং বিদেশেও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আফগানিস্তানে তিনি শিক্ষাকতা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বরোদা কলেজ, বিশ্বভারতী এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এক জায়গায় দীর্ঘদিন স্থির না থেকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হওয়া।

এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।

একজন বিশ্বনাগরিক বাঙালি

সৈয়দ মুজতবা আলীকে বোঝার জন্য “বিশ্বনাগরিক” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গেছেন। আফগানিস্তান, জার্মানি, ভারতসহ নানা দেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি পরিচয় হয়েছে। তিনি শুধু পর্যটকের চোখে দেশ দেখেননি। তিনি দেখেছেন মানুষের জীবন, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন আচরণ।

কিন্তু তাঁর এই বিশ্বপরিচয় তাঁকে নিজের দেশ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়নি।

বরং তিনি বুঝেছিলেন, অন্যকে জানতে হলে নিজের পরিচয়ও জানতে হয়। নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা এবং অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করা তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

‘দেশে বিদেশে‘: বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের এক অনন্য বই

সৈয়দ মুজতবা আলীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বইগুলোর একটি ‘দেশে বিদেশে‘।

আফগানিস্তানে তাঁর অবস্থান ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে রচিত এই গ্রন্থ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।

কিন্তু ‘দেশে বিদেশে’কে শুধু ভ্রমণকাহিনি বললে বইটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়।

এখানে আফগানিস্তানের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন যেমন আছে, তেমনি আছে ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

সবচেয়ে বড় কথা, বইটি লেখা হয়েছে অসাধারণ রসবোধের সঙ্গে।

সৈয়দ মুজতবা আলী পাঠককে শুধু তথ্য দেননি, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর চোখ দিয়ে পাঠক আফগানিস্তানের মানুষকে দেখেছে, তাদের জীবনযাপনকে চিনেছে এবং একই সঙ্গে লেখকের নিজের চিন্তা ও হাস্যরস উপভোগ করেছে।

ভ্রমণসাহিত্যে তাঁর বিশেষত্ব

বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনি অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণসাহিত্য আলাদা।

কারণ তিনি শুধু বলেননি, “আমি কোথায় গেলাম”।

তিনি বলেছেন, “আমি সেখানে কী দেখলাম, মানুষকে কীভাবে দেখলাম এবং সেই মানুষ আমাকে নিজের সম্পর্কে কী ভাবতে বাধ্য করল।”

তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে জায়গার চেয়ে মানুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শহর, একটি দেশ কিংবা একটি সংস্কৃতিকে তিনি মানুষের গল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। ফলে তাঁর ভ্রমণসাহিত্য একই সঙ্গে আনন্দদায়ক, জ্ঞানমূলক এবং চিন্তার খোরাক জোগায়।

রসবোধ: তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি

সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার কথা বলতে গেলে তাঁর হাস্যরসের কথা আলাদা করে বলতে হয়।

তিনি খুব কঠিন বিষয়ও এমনভাবে লিখতে পারতেন, যা পড়তে গিয়ে পাঠক হাসবেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে থাকত গভীর পর্যবেক্ষণ।

মানুষের দুর্বলতা, সমাজের অসংগতি, ভণ্ডামি, সংকীর্ণতা কিংবা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, সবকিছুকেই তিনি রসিকতার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

তাঁর হাস্যরস কখনো কেবল বিনোদন নয়। পাঠককে হাসাতে হাসাতে তিনি ভাবতেও বাধ্য করেছেন।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যকর্মের পরিধি অনেক বড়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • দেশে বিদেশে
  • পঞ্চতন্ত্র
  • চাচা কাহিনী
  • ময়ূরকণ্ঠী
  • শব্দপোড়া
  • অবিশ্বাস্য
  • জলে ডাঙায়
  • ভবঘুরে ও অন্যান্য
  • শহর–ইয়ার

এ ছাড়া তাঁর বিভিন্ন রচনা, গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি ও রম্যরচনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।

তাঁর সাহিত্যকে একক কোনো ঘরানায় আটকে রাখা কঠিন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও ভ্রমণকাহিনি, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন।

‘চাচা কাহিনী‘ ও মানুষের গল্প

তাঁর জনপ্রিয় রচনার মধ্যে ‘চাচা কাহিনী‘ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এখানে গল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের নানা স্বভাব, অভিজ্ঞতা ও জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর চরিত্রগুলো শুধু গল্পের চরিত্র নয়, অনেক সময় তারা একটি সময়, একটি সমাজ কিংবা মানুষের একটি বিশেষ মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে।

এই কারণেই তাঁর চরিত্রগুলো পাঠকের মনে সহজে জায়গা করে নেয়।

ভাষার প্রতি অসাধারণ দখল

সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষা।

তিনি বাংলা ভাষাকে খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বাক্যে একদিকে যেমন পাণ্ডিত্য আছে, অন্যদিকে তেমনই আছে কথাবার্তার স্বাভাবিকতা।

বাংলা, আরবি-ফারসি শব্দ, বিদেশি শব্দ এবং কথ্য ভাষা, প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি সবকিছুকে নিজের লেখায় ব্যবহার করেছেন।

তাঁর ভাষা কখনো ভারী হয়ে যায়নি। বরং জ্ঞান ও রসবোধের কারণে তাঁর লেখা পাঠকের কাছে সহজ ও আনন্দদায়ক হয়েছে।

মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা

সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য শুধু হাসি ও ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লেখায় রয়েছে মুক্তবুদ্ধির চর্চা।

তিনি মানুষের পরিচয়কে শুধু ধর্ম, জাতি বা দেশের সীমার মধ্যে দেখেননি। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁর দৃষ্টিকে আরও উদার করে তুলেছিল।

তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীর দরজা খোলা রাখতে হয়।

আজকের পৃথিবীতেও তাঁর এই চিন্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে একে অপরের কাছে এলেও মানুষের মধ্যে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণতা এখনো আছে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য সেই সংকীর্ণতার বিপরীতে একটি মুক্ত ও উদার মন তৈরি করতে সাহায্য করে।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক সৈয়দ মুজতবা আলী?

সৈয়দ মুজতবা আলীকে শুধু অতীতের একজন সাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে কৌতূহল।

তিনি জানতে চেয়েছেন। ভাষা শিখেছেন। দেশ ঘুরেছেন। নানা সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন।

অর্থাৎ তিনি সারাজীবন একজন শিক্ষার্থীর মতো ছিলেন।

আজ যখন পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়, তখনও প্রকৃত অর্থে পৃথিবীকে জানার জন্য যে মুক্ত মন দরকার, সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন ও সাহিত্য আমাদের সেই শিক্ষা দেয়।

মৌলভীবাজারের জন্য বিশেষ গর্ব

সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে মৌলভীবাজারের মানুষের গর্ব করার একটি বিশেষ কারণ আছে।

তাঁর পৈতৃক ভিটা এই জেলার দুর্লভপুরে। অর্থাৎ এই মাটির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক শিকড় জড়িয়ে আছে।

তাই তাঁকে স্মরণ করা শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন মহান লেখককে স্মরণ করা নয়; এটি আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও স্মরণ করা।

মৌলভীবাজারের মানুষ যদি তাঁর সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দিতে পারে, তাঁর জন্মভিটা ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ নেয়, তাহলে সেটি হবে তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

দীর্ঘ সাহিত্যিক ও কর্মময় জীবন শেষে সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায়।

তখন তাঁর বয়স ছিল ৬৯ বছর।

শারীরিকভাবে তিনি চলে গেলেও তাঁর সাহিত্য থেমে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর বইয়ের পাঠক বেড়েছে।

আজও তাঁর বই নতুন করে প্রকাশিত হয়, নতুন প্রজন্ম তাঁর লেখা পড়ে এবং তাঁর রসবোধ ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়।

শেষ কথা

সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনকে এক কথায় বলা যায়, বাংলার মাটি থেকে উঠে এসে পৃথিবীকে জানা এবং সেই পৃথিবীর অভিজ্ঞতা বাংলাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তাঁর শিকড় ছিল বাংলায়, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল বিশ্বজুড়ে।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অনেক কিছু জানার জন্য কৌতূহলী হতে হয়। অন্য মানুষকে বুঝতে হলে তার কাছে যেতে হয়। অন্য সংস্কৃতিকে জানতে হয়। আবার নিজের শিকড়কেও ভুলে গেলে চলে না।

মৌলভীবাজারের মাটির সঙ্গে যার পারিবারিক সম্পর্ক, সেই মানুষটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

এই কারণেই সৈয়দ মুজতবা আলী শুধু একজন সাহিত্যিক নন, তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক গর্বেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাঁর বই পড়া, তাঁর চিন্তাকে জানা এবং নতুন প্রজন্মের হাতে তাঁর সাহিত্য তুলে দেওয়া।

সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যতদিন পাঠক থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন