শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহী কবির জন্মজয়ন্তী ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা

২৬ মে ২০২৬ • Editing Section
৬২৬ বার দেখা
শেয়ার করুন

সাম্যের গান, মুক্তির সুরে এখনো প্রাসঙ্গিক জাতীয় কবি

— এস এম মেহেদী হাসান

আজ ২৫ মে। ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এই দিনে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অবিনশ্বর নক্ষত্র, কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না; ছিলেন শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক বজ্রকণ্ঠ, সাম্য ও মানবতার এক অনন্য প্রতীক।

স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও বিদ্রোহী চেতনা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। প্রতি বছর ২৫ মে বাংলাদেশে গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয় কবির জন্মজয়ন্তী।

দুঃখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি

১৮৯৯ সালের ২৫ মে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। ছোটবেলাতেই পিতৃহীন হয়ে দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। সেই থেকেই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায় ‘দুঃখু মিয়া’।

শৈশবে লেটো গানের দলে কাজ করা, রুটির দোকানে শ্রম দেওয়া, ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে পড়াশোনা এবং পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান তাঁর জীবনকে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করে।

১৯২১ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ব্রিটিশবিরোধী লেখার কারণে তাঁর একাধিক গ্রন্থ নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।

কারাগারে বসেই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত “রাজবন্দীর জবানবন্দী”, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি

নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক বিরল সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ তৈরি করেছিলেন। ইসলামি সংগীত, গজল, হামদ-নাতের পাশাপাশি তিনি শ্যামাসংগীত, ভজন এবং কীর্তনও রচনা করেন।

তিনি লিখেছেন:

  • “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে”
  • “কারার ওই লৌহকপাট”
  • “চল চল চল”
  • “আমি যদি রাঙাচরণ না পাই”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা সাহিত্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক সাম্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠগুলোর একটি ছিলেন নজরুল।

নজরুল গীতি ও সাহিত্যভুবন

কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় তিন হাজারের বেশি গান রচনা ও সুর করেন, যা আজ ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অগ্নিবীণা
  • দোলনচাঁপা
  • সিন্ধু-হিন্দোল
  • প্রলয়শিখা

এছাড়া গল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাসেও তিনি অসাধারণ অবদান রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুল

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের কবিতা ও গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচারিত হতো তাঁর গান ও কবিতা। বিশেষ করে “কারার ওই লৌহকপাট” এবং “চল চল চল” গান দুটি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করে।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

২০২৬ সালের জন্মজয়ন্তী আয়োজন

চলতি বছর কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে:

  • আলোচনা সভা
  • কবিতা আবৃত্তি
  • নজরুল সংগীত পরিবেশনা
  • সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
  • বিশেষ টেলিভিশন আয়োজন

এ বছর ঈদুল আজহার ছুটির আবহের মধ্যেও কবির জন্মজয়ন্তী ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।

আজও কেন প্রাসঙ্গিক নজরুল?

বিশ্লেষকদের মতে, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক বিভাজনের এই সময়ে নজরুলের সাম্যবাদী ও মানবিক দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

তাঁর সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—

“গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান”

আজও একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রেরণা জোগায়।

শেষ কথা

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল অতীতের কোনো কবি নন। তিনি বাঙালির সংগ্রাম, সাম্য, প্রতিবাদ ও মানবতার চিরন্তন প্রতীক। তাঁর কবিতা ও গান আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস জোগায়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় এবং মুক্তির স্বপ্ন দেখায়।

জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন