শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:১২ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস: সংকটে প্রকৃতি, এখনই কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান

২৩ মে ২০২৬ • Editing Section
৮০০ বার দেখা
শেয়ার করুন

— এস এম মেহেদী হাসান

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

একমুখী কৃষি ও বিদেশি গাছ: বাড়ছে পরিবেশ সংকট

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান মনে করেন, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক বন ও কৃষির বৈচিত্র্য কমে যাওয়া।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বনগুলো মূলত স্থানীয় প্রজাতির গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এবং সেই গাছের ওপর নির্ভর করেই প্রাণীদের খাদ্যচক্র ও বাস্তুসংস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক বনায়নের নামে বিদেশি গাছ লাগানো হচ্ছে, যা বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সংকট তৈরি করছে।”

তার মতে, মধুপুর বনের ঐতিহ্যবাহী শাল, বট, ডুমুর ও আমলকীর মতো দেশীয় ফলদ গাছ উজাড় করে সেখানে আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, রাবার ও আনারসের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ানো হয়েছে। ফলে বানর ও হনুমানের স্বাভাবিক খাদ্য কমে গেছে। এ কারণেই তারা বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের কৃষিতেও একমুখী ধানচাষ বা মনোকালচারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে উপকারী পোকামাকড়, মৌমাছি ও প্রাকৃতিক পরাগায়নকারী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

“দিন দিন চাষাবাদের জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যার ফলে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। কৃষি জমিতে ধান চাষের পাশাপাশি তৈলবীজ, ডাল, সূর্যমুখী ও দেশীয় ফলদ গাছের চাষ বাড়ানো গেলে উপকারী কীটপতঙ্গের সংখ্যা বাড়বে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। এমনকি জমির আইলেও এসব চাষ করলে কৃষক আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন,” বলেন ড. মঞ্জুর খান। তিনি মনে করেন, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা বা ‘ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকামাকড় প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সুন্দরবনের ভেতরের বাস্তবতা

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গনি গাজী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘টাইগার গনি’ নামে পরিচিত। জন্ম থেকেই সুন্দরবনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে বাঘ ও বনসংলগ্ন মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়লে সেটিকে নিরাপদে বনে ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাঘের আক্রমণের শিকার ১০৬ জন মানুষকে উদ্ধার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর, যাদের মধ্যে ২৬ জন এখনো জীবিত।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, “একটি বাঘের ডাক শুনেই বোঝা যায় সেটি পুরুষ না স্ত্রী। পায়ের ছাপ দেখেও বোঝা যায় বাঘটি সুস্থ কি না, এমনকি গর্ভবতী কি না।”

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, হরিণ শিকারের জন্য ফাঁদ পাতা এবং অবৈধ শিকার পুরো বনজ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সুন্দরবন এলাকায় বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিখোঁজ ও অবৈধ শিকারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

নদী ও মাছের সংকট

শ্যামনগরের জেলে আব্দুর রহিম মাঝি বলেন, “আগে নদীতে নানা ধরনের দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীতে বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও দূষণের কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এতে শুধু জেলেদের আয় কমছে না, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, বনের প্রাণীগুলো নদী ও খালের পানি পান করতে এসে এই বিষাক্ত পানির প্রভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। যারা নদীতে বিষ প্রয়োগ করছে, যারা বিক্রি করছে এবং যারা এই মাছ খাচ্ছে—আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। নদী ও খাল রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে মাছের অনেক প্রজাতিই চিরতরে হারিয়ে যাবে।

স্থানীয় জ্ঞান ও পরিবেশ রক্ষা

কৃষি-বাস্তুসংস্থান ও স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সংগঠন BARCIK-এর উপকূলীয় অঞ্চলের সমন্বয়কারী মো. শাহিন ইসলাম বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে জ্ঞান গ্রামীণ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে, তা পরিবেশ রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সুহেল বলেন, “জীববৈচিত্র্য রক্ষা শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, এটি আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।” অনেক সময় বনের রক্ষকরাই বন উজাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সরকারকে এখনই আমাদের হাওর, জলাশয় ও ফসলি জমি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি নেছার উদ্দিন বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবসম্মত প্রকল্প নিতে হবে এবং প্রতিটি প্রকল্পে সাংবাদিকদের যুক্ত করলে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী আনহার সমশাদ বলেন, “উন্নয়নের নামে বনভূমি ধ্বংস ও জলাশয় ভরাটের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। পর্যটনের নামে পরিবেশ ধ্বংস, কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” টাঙ্গুয়ার হাওরে অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট, উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলার কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ও পরিযায়ী পাখি আজ চরম হুমকির মুখে।

ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

মিশকাতুল কোরআন মাদ্রাসা মৌলভীবাজারের মুহতামিম মাওলানা শেখ সাদ আহমদ আমিন বর্ণভী ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, ইসলাম প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি সহানুভূতির শিক্ষা দেয়। কোরআন ও হাদিসে পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ এবং সৃষ্টির প্রতি সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর

‘কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন’-এর সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, খাসিয়া সম্প্রদায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বন ও প্রকৃতির ক্ষতি না করে সহাবস্থান করে আসছে। “বন রক্ষা করা মানে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা,” বলেন তিনি।

একই সুর শোনা গেল অভিজ্ঞ প্রান্তিক কৃষক ও কবি জুনেদ বিন জামানের (৫৮) কণ্ঠে। তিনি বলেন—

“বেশি ফলনের লোভে জমিতে বিষ আর রাসায়নিক সার ঢেলে আমরা মাটির প্রাণ, কেঁচো, ব্যাঙ আর মৌমাছির মতো বন্ধু জীবগুলোকে মেরে ফেলছি। প্রকৃতি ধ্বংস করার কারণেই এখন সময়মতো বৃষ্টি হয় না, খরা আর অতিবৃষ্টি বাড়ে। শুধু ফসল ফলালেই হবে না, মাটির স্বাস্থ্য আর চারপাশের পশুপাখিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রকৃতি বাঁচলে তবেই কৃষক বাঁচবে, আর কৃষক বাঁচলে দেশের মানুষ খেতে পাবে।”

উপসংহার

জীববৈচিত্র্য শুধু বন্যপ্রাণী বা গাছের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার টিকে থাকার ভিত্তি। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে তাই প্রয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতার আতিশয্য নয়, বরং প্রকৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারলেই কেবল টিকে থাকবে আগামী দিনের মানুষ ও আমাদের এই পৃথিবী।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন