ফলের বাজারে বিষের থাবা: জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে নীরব যুদ্ধ
।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।। ঢাকা, ১৯ মে — গ্রীষ্ম এলেই দেশের বাজারগুলো রঙিন হয়ে ওঠে আম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা মৌসুমি ফলে। প্রকৃতির এই দান যেমন মানুষের আনন্দের উৎস, তেমনি পুষ্টির অন্যতম ভরসাও। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমি ফলের বাজারে বেড়েছে এক অশনিসংকেত। মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে দেখা মিলছে অস্বাভাবিকভাবে চকচকে হলুদ আম ও টকটকে লালচে লিচুর, যার বড় একটি অংশই কৃত্রিম রাসায়নিক প্রয়োগে পাকানো বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফল দ্রুত বাজারজাত করতে ব্যবহার করছেন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন, ক্ষতিকর হরমোন ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক। ফলে বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় দেখালেও এসব ফল মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া তৈরি করছে।
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় বিপুল পরিমাণ কেমিক্যালযুক্ত আম জব্দ হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু ফল জব্দ হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংগঠিত একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “ক্যালসিয়াম কার্বাইড খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কোনো উপাদান নয়। এটি শরীরে প্রবেশ করলে পেটের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। রাসায়নিকযুক্ত অপরিপক্ব ফল শিশুদের মধ্যে এনসেফালোপ্যাথির মতো জটিল রোগের কারণ হতে পারে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর গণমাধ্যমে বিষাক্ত ফলের খবর প্রকাশ পেলেও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসনিক অভিযান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কিছুদিন আড়ালে থেকে আবারও একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তৎপরতার অভাব রয়েছে। শুধু অভিযান নয়, দ্রুত বিচার, উচ্চ অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে কারাদণ্ড নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি কোন ফল কখন প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহের উপযোগী, সেই মৌসুমি ক্যালেন্ডার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। মৌসুমের আগেই বাজারে আসা ফলের উৎস ও গুণগত মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি ভোক্তা সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রঙ, অতিরিক্ত চকচকে ত্বক কিংবা মৌসুমের আগেই বাজারে আসা ফল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে সাধারণ মানুষকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তাই বিষাক্ত ফলের বাণিজ্য বন্ধে এখনই কঠোর, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেখক:
জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।