নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্য কি নতুন সন্ধিক্ষণে?
এস এম মেহেদী হাসান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের নাম। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ক্ষমতার পালাবদল এবং নানা সংকট পেরিয়ে তিনি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্ষমতা, রাজনৈতিক কৌশল ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্বের পরও তাঁর ভবিষ্যৎ এখন নানা প্রশ্নের মুখে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, দুর্নীতির মামলা, বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্ক এবং গাজা যুদ্ধের পরিণতি তাঁর নেতৃত্বকে ক্রমাগত চাপে ফেলেছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এখন শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমীকরণেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে তাঁর বিদায় ঘটলেই যে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অনেক সিদ্ধান্ত ব্যক্তির চেয়েও বড় বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাকে সামনে রেখে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি অভিজ্ঞ ও কঠোর নেতৃত্বের প্রতীক। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে তিনি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছেন।
চরম ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন তাঁর সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। কিন্তু এই জোটের কারণে ইসরায়েলের মধ্যপন্থী ও উদারপন্থী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের দূরত্বও বেড়েছে। বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এসব সংস্কার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য দুর্বল করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর চাপ তৈরি করেছে। গাজা যুদ্ধের পর নিরাপত্তা ব্যর্থতা, জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বেড়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। তবে তাদের মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। মধ্যপন্থী, উদারপন্থী এবং ডানপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এক জায়গায় এলেও সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে তাদের মধ্যে ঐকমত্য ধরে রাখা সহজ নয়।
গাদি আইজেনকোটসহ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বিরোধী রাজনীতিকদের একটি অংশ নেতানিয়াহুর বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে বিরোধীদের রাজনৈতিক শক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে তাদের সাংগঠনিক ঐক্য, নির্বাচনী সমর্থন এবং সরকার পরিচালনার বাস্তব পরিকল্পনার ওপর।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে মধ্যপন্থী নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগও দেখা যেতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্ন কিংবা নিরাপত্তানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে নতুন সরকারের সামনে কঠিন রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধা থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন। নেতানিয়াহুর সরকারের সামরিক নীতি, গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে তাঁর সরকারের অবস্থানও নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজার পুনর্গঠন নিয়ে নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের মতো জটিল বিষয়গুলো নতুন সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—নেতানিয়াহুর বিদায় মানেই ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান আসবে, এমন নয়। ইসরায়েলের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা কেবল একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে নতুন নেতৃত্ব এলেও নীতিগত পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক চাপ—দুটিই প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র। সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গাজা যুদ্ধ এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় ইসরায়েলের সামরিক নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্কেও বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক স্বার্থের প্রশ্নে দেশটির মূল অবস্থান কতটা বদলাবে, তা নির্ভর করবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক চরিত্রের ওপর।
ইরানকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে প্রধান আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। অন্যদিকে ইরানও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধের রাজনীতিকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিদায় হলে ইরান প্রশ্নে কূটনৈতিক ভাষা ও কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নতুন কোনো সরকারের আমলেও পুরোপুরি দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন নেতৃত্ব কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এড়িয়ে এ ধরনের সম্পর্ক স্থায়ী করা কঠিন। ফলে ভবিষ্যতের কূটনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের প্রভাব সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ইসরায়েলের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তানীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপর তাঁর সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে।
তাঁর বিদায় ঘটলে ইসরায়েলের সামনে রাজনৈতিক সমঝোতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নতুন সরকার যদি একই ধরনের জাতীয়তাবাদী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতি অনুসরণ করে, তাহলে নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও সংকটের মৌলিক চরিত্র বদলাবে না।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার প্রশ্ন নয়; এটি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ভূমিকার সঙ্গেও জড়িত। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে ইসরায়েলকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমানো, ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা কোনো এক নেতার বিদায়ের ওপর নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।