শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

আত্মঘাতী উন্নয়ন: পরিবেশ ধ্বংসে জনস্বাস্থ্য ও অস্তিত্ব সংকটে বাংলাদেশ

৫ জুন ২০২৬ • Editing Section
৭১৯ বার দেখা
শেয়ার করুন

দূষণ, বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার, হাওর সংকট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি

— এস এম মেহেদী হাসান | বিশেষ প্রতিবেদন | ৫ জুন ২০২৬

পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ কখনো এত দ্রুত প্রকৃতিকে পরিবর্তন করেনি, যতটা করেছে গত একশ বছরে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, ভোগবাদী জীবনযাপন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার ব্যবহারের ফলে আজ পরিবেশ সংকট একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি, বায়ু ও পানি দূষণ, বন উজাড় এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার শুধু প্রকৃতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, হুমকির মুখে ফেলছে মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেও।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যখন পরিবেশ রক্ষার নানা অঙ্গীকার উচ্চারিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বাস্তবতা উদ্বেগজনক। দেশের নদী-নালা, বনভূমি, পাহাড়, কৃষিজমি ও জলাভূমি ক্রমাগত পরিবেশগত চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পবর্জ্য নদীতে পড়ছে, নদীর দূষণ গিয়ে মিশছে বঙ্গোপসাগরে, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা হচ্ছে, বন্যপ্রাণী পাচার অব্যাহত রয়েছে, আর অপরিকল্পিত নগরায়ণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

দূষণ ও প্লাস্টিকের ভয়াবহতা

বাংলাদেশে শিল্পকারখানা, ইটভাটা, নির্মাণকাজ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ধোঁয়ায় বায়ুদূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব বর্জ্য নদী, খাল ও সমুদ্রে গিয়ে জমা হয়ে জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

নদী থেকে সমুদ্রে বিষের স্রোত

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, পদ্মা, মেঘনাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ফেলা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এসব দূষণ নদী পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশছে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও নীল অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক ইতোমধ্যে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরেও পৌঁছাচ্ছে।

সুন্দরবন ও বন্যপ্রাণীর ওপর হুমকি

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনেও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ফলে শুধু মাছ নয়, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীও ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হাওর ও জলাভূমি সংকটে

টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর ও কাউয়াদিঘি হাওরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলো পর্যটনের চাপ, বর্জ্য দূষণ, অপরিকল্পিত ফিশারি এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওর ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।

জনস্বাস্থ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষিত পানি মানুষের লিভার, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। খোলা জায়গায় প্লাস্টিক ও চিকিৎসাবর্জ্য পোড়ানোর ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি সৃষ্টি করছে।

আইনের প্রয়োগ ও নাগরিক সচেতনতা জরুরি

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।

উপসংহার

পরিবেশ রক্ষা শুধু একটি দিবস পালনের বিষয় নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। নদী, বন, সমুদ্র, হাওর ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন