রক্তাক্ত কলম ও রুদ্ধ কণ্ঠ: বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অগ্নিপরীক্ষা
৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হলেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা যেন ভিন্ন এক গল্প বলে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়টি অনেক সাংবাদিকের কাছে স্বাধীনতার নয়, বরং ভয়, মামলা, হামলা ও প্রতিহিংসার এক কঠিন অধ্যায়।
বাংলাদেশের এই অন্তর্বর্তী সময়কে অনেক সাংবাদিকই আখ্যা দিয়েছেন “অন্ধকার অধ্যায়” হিসেবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গণমাধ্যমে যে মুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে গড়ে ওঠেনি—এমন অভিযোগ রয়েছে। বরং সাংবাদিক মহলের দাবি, এই সময়ে কিছু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সাংবাদিকদের টার্গেট করে পরিকল্পিত হয়রানিতে জড়িয়েছে।
আরও একটি আলোচিত অভিযোগ হলো—পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী হিসেবে সমালোচিত কিছু ব্যক্তি নতুন বাস্তবতায় অবস্থান বদলে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক সময়, বিশেষ করে ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বকাল ঘিরে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের সংবাদমাধ্যম এক অস্বস্তিকর ও কণ্টকাকীর্ণ সময় পার করছে। পরিবর্তনের আশাবাদ থাকলেও বাস্তবে শত শত সাংবাদিক মামলা, গ্রেফতার, হামলা এবং প্রাণনাশের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। প্রায় দেড় বছরজুড়ে এই পরিস্থিতি সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কঠিন অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী—
অনেক সাংবাদিকের ভাষায়, “সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে আত্মরক্ষাই বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৫৫ জন সাংবাদিক কারাবন্দি হন। পরিচিত মুখদের গ্রেফতার ও রিমান্ডের ঘটনা পেশাজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
এই সময়ে—
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর চাপ তৈরি করেছে।
ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক। বরিশাল ও খুলনায় দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবেদন করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় প্রেস ক্লাব দখল ও বিভক্তির ঘটনা বেড়ে যায়। এর ফলে প্রায় ২০% মফস্বল সাংবাদিক পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিক এস এম মেহেদী হাসানের ওপর হামলার ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, হত্যা মামলার আসামি ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযুক্তদের একটি দল এই হামলা চালায়।
সহকর্মীদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল না; বরং স্থানীয় সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে সাংবাদিক মো. আনোয়ার হোসেনের ঘটনাও উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী—
পরিবারের দাবি, স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তিনি টার্গেট হয়েছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই ঘটনাকে অনেকেই সাংবাদিক পরিচয় বিকৃত করে আইনি চাপ প্রয়োগের একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। সহকর্মীদের দাবি, অপরাধচক্রের ভিডিও ধারণ করাই তাঁর ‘অপরাধ’ ছিল। একই সময়ে আরেক সাংবাদিকের ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনাও ঘটে।
এক বছরে অন্তত তিনজন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, “পাইকারি মামলা” সংস্কৃতি সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
২০২৪ থেকে ২০২৬—এই সময়কাল বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে বহু সাংবাদিক হামলা, মামলা ও পরিচয় সংকটে পড়েছেন।
যখন সাংবাদিকরা খবরের নির্মাতা না হয়ে নিজেরাই খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠেন, তখন তা শুধু একটি পেশার সংকট নয়; বরং গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার জন্য বড় সতর্কবার্তা।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের তাই নতুন করে প্রশ্ন করতে শেখায়—
সত্য বলার অধিকার কি সত্যিই নিরাপদ?
লেখক
এস এম মেহেদী হাসান
সদস্য, কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি, বাংলাদেশ রিপোর্টার কাউন্সিল (বিআরসি)
সাধারণ সম্পাদক, প্রবাসী স্বজন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ