শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:২৯ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং

বার্ধক্যের বাংলাদেশ: আইন আছে, নিরাপত্তা কোথায়?

১৫ জুন ২০২৬ • Editing Section
৬২৩ বার দেখা
শেয়ার করুন

এস এম মেহেদী হাসান

১৫ জুন ২০২৬ | বিশ্ব বয়োজ্যেষ্ঠ নির্যাতন সচেতনতা দিবস

রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয় মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ পর। একই ছাদের নিচে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে অবহেলা, অসুস্থতা এবং নিঃসঙ্গতার মধ্যে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবেশীদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবীণ বাবা-মাকে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা কিংবা বৃদ্ধা শাশুড়িকে নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

একই সময়ে বাংলাদেশ দ্রুত একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, চিকিৎসাসেবার প্রসার এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কি বাড়ছে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা?

বিশ্ব বয়োজ্যেষ্ঠ নির্যাতন সচেতনতা দিবসে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে: বাংলাদেশ কি তার প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রস্তুত?

দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার চিত্র

একসময় বাংলাদেশকে তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই বাস্তবতা এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৫ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশই প্রবীণ।

এর মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি।

জনস্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৫.৫ বছরে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জও।

গবেষকদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ তখন দেশের প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন হবেন প্রবীণ। এমনকি শিশুদের তুলনায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থাৎ প্রবীণদের প্রশ্ন আর কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিবার কাঠামো এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

প্রবীণ নির্যাতন: যে সহিংসতার অনেকটাই অদৃশ্য

প্রবীণ নির্যাতন বলতে সাধারণত শারীরিক আঘাত বা মারধরকে বোঝানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়জন প্রবীণের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশেও নির্যাতনের ধরনগুলো প্রায়ই দৃশ্যমান নয়।

একজন প্রবীণকে দিনের পর দিন একা ফেলে রাখা, তার সঙ্গে কথা না বলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে গুরুত্ব না দেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা তার সম্পত্তির ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও নির্যাতনের আওতায় পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণরা একই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাস করলেও বাস্তবে তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন। বিশেষজ্ঞরা একে বলেন সোশ্যাল আইসোলেশন বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ, হৃদরোগ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের নির্যাতনের অধিকাংশই ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে ঘটে এবং আইনি কাঠামোর আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কী বলছে?

গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবীণদের ওপর নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ওই দম্পতিকে পরে আশ্রয়ের জন্য আত্মীয়স্বজনের দ্বারস্থ হতে হয়।

রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রবীণ মা কিংবা শাশুড়িকে নির্যাতনের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, কোথাও চিকিৎসা ও খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রবীণ নির্যাতন কেবল দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়। এটি সমাজের প্রায় সব স্তরেই ছড়িয়ে পড়া একটি নীরব সংকট।

উচ্চশিক্ষা বাড়ছে, মানবিকতা কি কমছে?

প্রবীণ নির্যাতনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো, এর অনেক ঘটনা উচ্চশিক্ষিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারে ঘটছে।

মিরপুরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, একক পরিবার ব্যবস্থা, কর্মজীবনের চাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের সংকোচন অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের জীবনে নতুন ধরনের একাকীত্ব তৈরি করছে।

অনেক পরিবারে বাবা-মায়ের জন্য আলাদা ঘর আছে, চিকিৎসার খরচও হয়তো দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। তাদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি বা মতামতের মূল্য নেই। তারা একই বাড়িতে থেকেও পরিবারের সক্রিয় সদস্য নন।

এটি শারীরিক নির্যাতন নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি করে।

বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে প্রবীণদের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি ছিল। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন, বিদেশমুখী কর্মসংস্থান এবং পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনের ফলে সেই কাঠামোতে ফাটল দেখা যাচ্ছে।

বৃদ্ধাশ্রম: সমাধান নাকি শেষ আশ্রয়?

প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবীণ নিবাস বা বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা এখনো খুব সীমিত। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে বড়জোর ৩৫ থেকে ৪০টি উল্লেখযোগ্য প্রবীণ নিবাস রয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে কয়েক হাজার মানুষের বেশি আবাসনের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ।

এই বাস্তবতায় বৃদ্ধাশ্রম কোনো ব্যাপক সমাধান হতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় অধিকাংশ প্রবীণ বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারেই থাকতে চান। তারা জীবনের শেষ অধ্যায়ে পেশাদার সেবার পাশাপাশি সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়স্বজনের সান্নিধ্য প্রত্যাশা করেন।

তাই বৃদ্ধাশ্রমকে মূল সমাধান হিসেবে নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতির একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত।

আইন আছে, প্রয়োগ কতটা?

প্রবীণদের সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো একেবারে অনুপস্থিত নয়।

২০১৩ সালে প্রণীত পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব হলো তার বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা। আইনটি শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের বিষয় নয়; চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সঙ্গ প্রদানের বিষয়ও গুরুত্ব দেয়।

আইন অনুযায়ী কোনো সন্তান তার বাবা-মাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিত্যাগ করতে পারে না কিংবা তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা এবং সংবিধানের সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিধানও প্রবীণদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন নির্যাতনের ঘটনা কমছে না?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণগুলোর একটি হলো প্রবীণদের নীরবতা। অনেক বাবা-মা সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চান না। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সন্তানের প্রতি আবেগ তাদের অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত করে।

অন্যদিকে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে এখনো অনেক মানুষ জানেন না যে তাদের সুরক্ষায় এমন আইন বিদ্যমান।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: ইতিবাচক বার্তা, কিন্তু আরও অনেক পথ বাকি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের নাগরিকদের জন্য ট্রেনে বিনামূল্যে যাতায়াত এবং মেট্রোরেলের ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা এসেছে।

এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ প্রবীণদের সামাজিক অংশগ্রহণ এবং চলাচলের সুযোগ বাড়ানো তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, আগামী দুই দশকে যে পরিমাণ প্রবীণ জনগোষ্ঠী যুক্ত হবে, সেই তুলনায় দেশের জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যবস্থা এবং প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক।

প্রবীণদের জন্য হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব।

ভাতা বাড়ানো সম্ভব।

আইন প্রণয়ন করাও সম্ভব।

কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা, সম্মানবোধ এবং দায়িত্বশীলতা আইন দিয়ে বাধ্যতামূলক করা যায় না।

যদি পরিবার প্রবীণদের বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে কোনো নীতিমালাই পুরো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

তাই স্কুল থেকে শুরু করে পরিবার, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে কাজ করতে হবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নানা সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের মানবিক অগ্রগতি কেবল সেতু, মেট্রোরেল বা উঁচু ভবন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ, সবচেয়ে নির্ভরশীল এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের কতটা মর্যাদা দিচ্ছে।

আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। আজ আমরা আমাদের বাবা-মা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে যে আচরণ করছি, ভবিষ্যতে সমাজও আমাদের সঙ্গে সেই আচরণই করবে।

বিশ্ব বয়োজ্যেষ্ঠ নির্যাতন সচেতনতা দিবসে তাই প্রতিজ্ঞা হোক, প্রবীণদের নিরাপত্তা শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রশ্ন। কারণ কোনো মানুষ যেন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে নিজের ঘরেই পরবাসী হয়ে না পড়েন। এ দায় আমাদের সবার।

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন