রক্তে বাঁচে জীবন: দুর্যোগে বাংলাদেশের মানবতার নীরব নায়করা
১৪ জুন ২০২৬ | বিশ্ব রক্তদাতা দিবস
এস এম মেহেদী হাসান
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। হাসপাতালের করিডোরে উৎকণ্ঠিত স্বজনদের ভিড়। চিকিৎসক জানিয়ে দিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে দুই ব্যাগ রক্ত না পেলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন। আত্মীয়-স্বজনের কারও রক্তের গ্রুপ মেলেনি। শুরু হয়েছে ফোনকল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ।
ঠিক তখনই কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা হাসপাতালে এসে হাজির হন। রোগীর সঙ্গে তাদের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, আগে কখনো দেখাও হয়নি। তবু একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ছুটে এসেছেন।
বাংলাদেশে এমন দৃশ্য প্রতিদিনই দেখা যায়।
দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা জাতীয় সংকটের সময় এই মানবিক শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে, হাসপাতালগুলো হিমশিম খায়, তখন অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা নীরবে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে পড়েন।
প্রতি বছর ১৪ জুন পালিত হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিবসটি শুধু রক্তদাতাদের সম্মান জানানোর উপলক্ষ নয়; এটি মানবতা, সামাজিক সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য প্রতীক।
বাংলাদেশে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়—
বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্তসঞ্চালন ছাড়া জীবনধারণ সম্ভব নয়। দেশে হাজারো শিশু ও তরুণ নিয়মিত রক্তের ওপর নির্ভরশীল।
চাহিদা বাড়লেও সংকট এখনও বাস্তবতা, বিশেষ করে বিরল রক্তের ক্ষেত্রে।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে রক্তের তীব্র সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ রক্ত দিতে হাসপাতালে ছুটে আসেন।
অনেক ব্লাড ব্যাংক তখন সাময়িকভাবে রক্ত সংগ্রহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।
এই ঘটনা বাংলাদেশের মানবিক সংহতির এক ঐতিহাসিক উদাহরণ।
২০২০ সালের করোনা মহামারিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আসে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি।
বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্লাজমা সংগ্রহ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে রোগী ও দাতার সংযোগের প্রধান মাধ্যম।
অনেক সুস্থ হওয়া রোগী নিজের প্লাজমা দান করে অন্যের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।
২০১৯ ও ২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে রক্ত ও প্লাটিলেটের সংকট দেখা দেয়।
সেই সময়:
সবাই মিলে রক্তদাতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। অনেক তরুণ ক্লাস বা অফিস শেষে সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দিয়েছেন।
২০২২ সালের সীতাকুণ্ড বিস্ফোরণ এবং ২০১৯ সালের চকবাজার অগ্নিকাণ্ডে আবারও দেখা গেছে একই চিত্র—
সংকটের মুহূর্তে রক্তদাতাদের ঢল নেমেছে হাসপাতালে।
একসময় রক্তের জন্য আত্মীয়দের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
এরা রক্তদান আন্দোলনকে একটি সংগঠিত রূপ দিয়েছে। এখন একটি ফেসবুক পোস্টেই মিনিটের মধ্যে রক্তদাতা পাওয়া যায়।
তবুও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে—
ফলে অনেক সময় জরুরি মুহূর্তে পরিবারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয়।
“এক ব্যাগ রক্ত শুধু চিকিৎসা নয়, এটি একটি জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ।”
বাংলাদেশের প্রতিটি বড় সংকটে একদল মানুষ নীরবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রচারের আলো খোঁজেন না, কিন্তু তাদের দেওয়া এক ব্যাগ রক্তই বাঁচিয়ে দেয় একটি জীবন।
রানা প্লাজা, করোনা, ডেঙ্গু বা যেকোনো দুর্যোগ—সবখানেই প্রমাণ হয়েছে, মানবতা এখনো বেঁচে আছে।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস তাই কেবল সম্মান জানানো নয়; এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকার—রক্তদান হবে দায়িত্ব, মানবিকতা এবং নিয়মিত চর্চা।
এস এম মেহেদী হাসান
সদস্য, আহ্বায়ক কমিটি
বাংলাদেশ রিপোর্টার্স কাউন্সিল (বিআরসি)
ই-মেইল: sm.mehedi.hasan1977@gmail.com