ভূমি অধিকার দিবস: খাসজমি দখল আর মামলার জটে ভূমিহীনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
এস এম মেহেদী হাসান
“বাপ-দাদার আমল থাইকা এই চরে আছি। চরের জমি যখন জাগলো, ভাবছিলাম আমাগো কপাল খুলবো। কিন্তু জাল কাগজ বানাইয়া এলাকার প্রভাবশালীরা আমাগো উচ্ছেদ কইরা দিল।”
সিরাজগঞ্জের নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত কৃষক সোলেমান মিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত এই বেদনা যেন বাংলাদেশের লাখো ভূমিহীন মানুষেরই আর্তনাদ। প্রতি বছর ১০ জুন ‘ভূমি অধিকার দিবস’ পালিত হলেও ভূমির ন্যায্য অধিকার এখনও অনেকের জন্য অধরা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ জমি সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট বিচারাধীন মামলার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জমি বিরোধের সঙ্গে জড়িত। মালিকানা, নামজারি, জাল দলিল ও অবৈধ দখলকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ দিন দিন বাড়ছে।
জমি সংক্রান্ত বিরোধ সাধারণত তিন ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়:
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সংকট দীর্ঘদিনের। আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন, যাদের বড় অংশ পার্বত্য অঞ্চলে।
১৯০০ সালের পার্বত্য রেগুলেশন, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ, জনমিতিক পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সংঘাতের কারণে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির পর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠিত হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়।
ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা যখন কোটি ছাড়িয়েছে, তখন সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বিপুল পরিমাণ জমি বেদখলে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের শত শত একর জমি, খাসজমি এবং ক ও খ তফসিলভুক্ত সম্পত্তির বড় অংশও প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অনেক এলাকায় বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক বাগান, খামার, রিসোর্ট ও বিভিন্ন প্রকল্প। এতে যেমন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ ভূমিহীন। একই সঙ্গে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের নিজস্ব বাসস্থান নেই অথবা তারা স্থায়ী আবাসন সংকটে রয়েছেন।
এই বাস্তবতা ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্যের একটি বড় প্রতিফলন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভূমি বিরোধ কমাতে এবং ভূমিহীনদের পুনর্বাসনে সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মামলা কমবে।
খুলনা জজ কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, “জমি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হলে জমি নিবন্ধনের সময় শতভাগ ডিজিটাল যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (ADR) আরও কার্যকর করতে হবে।”
বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদের সহ-সভাপতি মো. নেছার উদ্দিন বলেন, “সরকার ভালো আইন করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও দালালচক্র পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ফলে প্রকৃত ভূমিহীনরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”
মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আনিছুজজামান বায়েছ বলেন, ভূমি অধিকার বাস্তবায়নে সরকারি জমি উদ্ধার এবং ভূমিদস্যুতা বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আনিছুজ্জামান বায়েছ। তিনি বলেন,
“বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশে বিপুল পরিমাণ সরকারি বনভূমি, খাসজমি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। বিশেষ করে বনভূমি দখল করে অনেক জায়গায় বাণিজ্যিক বাগান, খামার ও অন্যান্য প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকৃত ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আইন অনুযায়ী এসব সরকারি জমি উদ্ধার করে ভূমিহীন মানুষের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং বহু পরিবার স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।
বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং দলিল জালিয়াতি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করি, অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে সরকারি জমি উদ্ধার এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি ও ভূমিদস্যুতা রোধ করা গেলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।”
অন্যদিকে, মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসান আহমেদ জাভেদের মতে, “ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা গেলে যেমন বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাড়বে, তেমনি প্রান্তিক মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় ডিড রাইটারদের মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রারদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদের সহ-সভাপতি মো. নেছার উদ্দিন বলেন, ভালো আইন প্রণয়ন হলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ও দালালচক্রের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে অনেক ভূমিহীন মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন:
ভূমি অধিকার শুধু জমির মালিকানার প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার। ভূমি অধিকার দিবসের মূল বার্তা হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক যেন বৈষম্য ও দখলদারিত্বের শিকার না হয়ে ন্যায্য ভূমি অধিকার ভোগ করতে পারে। সরকারি খাসজমি ও বেদখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।