সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের সেতুবন্ধ
এস এম মেহেদী হাসান
আজ ২১ মে, বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস (World Day for Cultural Diversity for Dialogue and Development)। ২০০১ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিষয়ক সার্বজনীন ঘোষণার পর ২০০২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রার বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো। একই সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে পারস্পরিক সংঘাত দূর করে টেকসই উন্নয়ন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি কেবল একটি জাতির পরিচয় নয়, বরং তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের জিডিপির ৩.১ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের ৬.২ শতাংশ আসে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল খাত (Cultural and Creative Industries) থেকে। তাই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানব সভ্যতার টিকে থাকার অন্যতম শর্ত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বৈচিত্র্যের এক অনুপম ক্যানভাস
বাংলাদেশ আবহমানকাল ধরেই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনন্য চারণভূমি। এখানে বাঙালি সংস্কৃতির হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে মণিপুরী, খাসিয়া, সাঁওতাল, গারো, চাকমাসহ ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, উৎসব ও জীবনধারা।
বাংলাদেশের বহুভাষিক বৈচিত্র্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিলেটি ভাষা। ক্রীড়া সংগঠক অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ মম মনে করেন, বিশ্বে প্রায় দুই কোটি মানুষ সিলেটি ভাষায় কথা বলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি সিলেটি ভাষার ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত, যা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক সিলেটি ভাষাভাষী মানুষের বসবাস রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি সিলেটি ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি দীর্ঘদিনের এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ পরম সহনশীলতায় একসঙ্গে বসবাস করে আসছে।
মনু থিয়েটারের পর্যবেক্ষণ: সংকট ও উত্তরণের পথ
বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবসের তাৎপর্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী নাট্যসংগঠন ‘মনু থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিশিষ্ট নাট্যজন আ স ম সালেহ সুহেল।
তিনি বলেন, “সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কোনো কৃত্রিম বিষয় নয়, এটি প্রকৃতির মতোই স্বাভাবিক ও সুন্দর। মণিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা কিংবা চা জনগোষ্ঠীর জীবনধারা মূলধারার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, এসব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। তা না হলে বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির চাপে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং শিকড়কে ধরে রেখে অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
ইনডিপেনডেন্ট টিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক নাসরীন গীতি মনে করেন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মূলধারার গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
টেকসই উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ভূমিকা অপরিসীম। ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি সহনশীলতা সামাজিক সংঘাত কমায় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
অর্থনৈতিকভাবে লোকশিল্প, কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব পর্যটন শিল্পকে গতিশীল করতে পারে। একই সঙ্গে সংস্কৃতি সংলাপ ও শান্তির ভিত্তি তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য জরুরি।
উপসংহার
সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি প্রবহমান নদীর মতো। এই প্রবাহে কোনো ভাষা বা ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবসে এটাই হোক অঙ্গীকার—পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা, প্রতিটি সুর এবং প্রতিটি ঐতিহ্য তার নিজস্ব মহিমায় টিকে থাকুক; আর সেই বৈচিত্র্যের সুতায় গড়ে উঠুক বিশ্বশান্তির এক মজবুত বন্ধন।