বাংলাদেশে বাড়ছে এইডস ঝুঁকি, নতুন আক্রান্তের ৪২% অবিবাহিত তরুণ-তরুণী
এস এম মেহেদী হাসান | বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৮ মে — বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। একসময় রোগটিকে সীমিত কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বা প্রবাসফেরত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা হলেও, সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। এখন দেশের তরুণ সমাজই ধীরে ধীরে এই মরণঘাতী ভাইরাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে।
আজ ১৮ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব এইডস ভ্যাকসিন দিবস’ (World AIDS Vaccine Day)। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ (NASP)-এর সাম্প্রতিক তথ্য বাংলাদেশের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নতুন শনাক্ত হওয়া এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশই অবিবাহিত তরুণ-তরুণী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অনিরাপদ সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, সচেতনতার অভাব এবং পরীক্ষার সীমিত সুযোগ মিলিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এইডস সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এরপর ২০০০ সালে এইডসজনিত প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ সময় সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডস (UNAIDS) ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নতুন আক্রান্তদের বড় অংশের বয়স ২০ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে এবং তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ অবিবাহিত তরুণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন তরুণদের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা সহজেই অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সুরক্ষাহীন শারীরিক সম্পর্ক সংক্রমণের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের মধ্যে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ বাড়ছে। একই সিরিঞ্জ বা সুই একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করায় দ্রুত ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেক তরুণ এখনো মনে করেন এইডস “অন্যদের রোগ”। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ আচরণ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা দেখা যায়।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় উচ্চ সংক্রমণ ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া বিদেশফেরত শ্রমিকদের মাধ্যমেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঘটনা ঘটছে।
সংক্রমণ বাড়লেও দেশের বড় অংশের মানুষ এখনো আধুনিক এইচআইভি পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস কর্মসূচির নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অন্তত ৪১টি জেলায় সরকারিভাবে পর্যাপ্ত এইচআইভি শনাক্তকরণ ও কাউন্সেলিং সেবা নেই।
বিশেষ করে যেসব জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেই অথবা যেগুলো প্রান্তিক, দুর্গম ও অবহেলিত অঞ্চল, সেখানে এই সংকট বেশি।
কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, নাটোর, গাইবান্ধা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শেরপুর ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলায় আধুনিক স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিং সেন্টারের ঘাটতি রয়েছে।
ঝালকাঠি, পিরোজপুর, নড়াইল, মাগুরা, মেহেরপুর, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের কিছু দুর্গম এলাকায়ও পর্যাপ্ত এইডস স্ক্রিনিং সুবিধা নেই।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, এসব এলাকায় সাধারণ রক্ত পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও এইচআইভির নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা (Confirmatory Test) ও বিশেষায়িত কাউন্সেলিং সেন্টারের অভাব রয়েছে। ফলে সন্দেহভাজন রোগীদের বিভাগীয় শহর বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। দীর্ঘসূত্রতা ও সামাজিক ভয় অনেককে পরীক্ষা করাতে নিরুৎসাহিত করছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমৃদ্ধ জেলাগুলোতে তুলনামূলক উন্নত সেবা রয়েছে।
কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, যশোর ও চাঁদপুরের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও সরকার বিশেষ স্ক্রিনিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (NICVD) অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এম. এ. বাকী বলেন,
“নতুন আক্রান্তদের ৪২ শতাংশই অবিবাহিত তরুণ—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ। অথচ অনিরাপদ সম্পর্ক, মাদকাসক্তি ও অসচেতনতা তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”
তিনি আরও বলেন, “এইডস এখন আর দূরের কোনো রোগ নয়। সচেতনতা, নিরাপদ জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।”
১৯৯৭ সালের ১৮ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এক ভাষণে এইচআইভি প্রতিরোধে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির আহ্বান জানান। তার এক বছর পর থেকে বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব এইডস ভ্যাকসিন দিবস’ পালিত হচ্ছে।
দিবসটির মূল লক্ষ্য:
বিজ্ঞানীদের মতে, এইচআইভি ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। এছাড়া এটি সরাসরি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই আক্রমণ করে। ফলে ভ্যাকসিন তৈরি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।
তবে বর্তমানে করোনা টিকায় ব্যবহৃত mRNA প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন গবেষণায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি সম্ভাবনাময় ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে মানবদেহে পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে এআরটি (Antiretroviral Therapy) ওষুধের মাধ্যমে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। সরকারও বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে।
তবে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে আক্রান্ত না হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে এখনই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা, নিরাপদ আচরণ, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং সহজলভ্য পরীক্ষা ব্যবস্থাই পারে এই নতুন সংকট মোকাবিলা করতে।