শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
৬৮৭ বার দেখা
শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার, ১৬ মে — সাহিত্য দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা করতাম। আমার মেজো মামা, বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী শাহিদুর রহমান চৌধুরী লখনুর সম্পাদনা ও প্রকাশনায় মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক সংলাপ। ১৯৮৮ সালে সেই পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। অবশ্য সম্পাদকীয় সংশোধন ছিল। আজ বুঝি, সেটাই ছিল আমার প্রথম শিক্ষা। এরপর বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে কবিতা, ছড়া ও গল্প প্রকাশ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। সাংবাদিকতায় আসা অনেক পরে।

তবে সাংবাদিকতায় আসার পেছনে একটি তিক্ত কিন্তু গভীর শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা আজও আমাকে নাড়া দেয়।

সময়টা ১৯৯৮ সালের অক্টোবর। একটি মিথ্যা মামলায় আমাকে কারাগারে যেতে হয়। কারাগারে থাকার সময় জানতে পারি, সাপ্তাহিক মনুবার্তা পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যেখানে লেখা হয়েছে আমি নাকি পিস্তল নিয়ে ঘুরাঘুরি করতাম। অথচ বাস্তবে তখন পর্যন্ত আমি পিস্তল নামের অস্ত্রটিই চোখে দেখিনি।

জেল থেকে মুক্ত হয়ে বিষয়টি পত্রিকার সম্পাদক, পরবর্তীতে সিপিবির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আবু জাফর ভাইকে জানাই। তিনিও বিষয়টি শুনে বিস্মিত হন। পরে জানতে পারি, রূপক নামের একজন সেই সংবাদটি করেছিলেন। কিছু করার সুযোগ তখন আর ছিল না। দীর্ঘদিন সেই সাংবাদিককে খুঁজেছি, কিন্তু পরে জানতে পারি তিনি আর সাংবাদিকতা পেশায় নেই।

সে সময় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন আকমল হোসেন নিপু, যিনি বর্তমানে প্রথম আলো পত্রিকার মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পট পরিবর্তনের পর মামলার রায় হয় এবং আমি খালাস পাই। সেই মিথ্যা সংবাদই আমার জীবনে বড় এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ থেকেই সাংবাদিকতায় আত্মপ্রকাশের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিই। আজ মনে হয়, সেই অন্যায় সংবাদই আমাকে সাংবাদিক হিসেবে পথচলা শুরু করতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল। এই বিষয়টি নিয়েই বিস্তারিতভাবে লেখার চেষ্টা করব।

লেখালেখির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমার বন্ধু মোঃ সালেহ আহমদ স’লিপকের প্রতি। তাঁর লেখা যতি চিহ্ন বই থেকে দাড়ি, কমা, কোলন, ড্যাশসহ লেখার মৌলিক বিষয়গুলো আমি রপ্ত করেছি। এই জ্ঞান আমার সাংবাদিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং লেখার মান উন্নত করতে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে। তিনি মূলত সাহিত্যের মানুষ; সাংবাদিকতায় এসেছেন পরে। আজকের দৈনিক মৌমাছিকণ্ঠ পত্রিকা যখন সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন এই পত্রিকার নামকরণের মূল ভাবনাও ছিল তাঁর। একঝাঁক মৌমাছি থেকেই জন্ম নেয় মৌমাছিকণ্ঠ।

সাংবাদিকতায় আমার পথচলার পেছনে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মরহুম সৈয়দ মোহাম্মদ আতাহারকে। তিনি আমাকে নিজে নিজে লিখতে বাধ্য করতেন। বিভিন্ন স্থানে রিপোর্টিংয়ে পাঠাতেন। নিউজ লিখলে পাশে বসে সংশোধন করাতেন, আবার লিখাতেন, আবার চেক করতেন। প্রয়োজনে নিজেই এডিট করতেন। প্রথমে বেতারের জন্য প্রিন্ট হতো, পরে বিভিন্ন নামে (শুধু প্রতিবেদকের নাম পরিবর্তন করে) আবার প্রিন্ট করা হতো। এরপর ফ্যাক্সযোগে নিউজ পাঠানো হতো।

মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহিন নিয়মিত বলতেন, “নিজে নিজে লেখো।”

মৌলভীবাজার নাগরিক সমাজ ‘মৌনাস’ থেকে মৌলভীবাজার সদরের বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সাধারণ বিষয়ে মেধা যাচাই পরীক্ষা গ্রহণ করা হতো। পরীক্ষায় তিনজন শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হতো। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অনেকেই উপস্থিত থাকতেন, বিশেষ করে সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। এর পেছনেও একটি বিশেষ কারণ ছিল, যা পরে কোনো একদিন বলব।

তেমনি নুরুল ইসলাম শেফুল, সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহিন, নজরুল ইসলাম মুহিব প্রায়ই এসব অনুষ্ঠানে যেতেন। একদিন নুরুল ইসলাম শেফুল “দৈনিক নাগরিক” নামের একটি পত্রিকা হাতে দিয়ে বললেন, “এই পত্রিকায় নিউজ পাঠাও, লেখা পাঠাও।” সেখান থেকেই সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতার পথচলা শুরু হয়। তাঁর অবদান কখনও ভুলে যাওয়ার নয়।

নুরুল ইসলাম শেফুল ভাইসহ আরও অনেকে লেখার উপর জোর দিতেন। তাঁদের চাপ, উৎসাহ এবং আল্লাহ তায়ালার কৃপায় লিখতে শিখেছি। আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

মরহুম আতাহার ভাই সবসময় বলতেন, “সৎ সাংবাদিকতার পথ কঠিন, বিপদ আসবে কিন্তু কেটে যাবে।” নিউজ করার জন্য কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো না। টাকার পেছনে না ঘুরে সাংবাদিকতা শেখার পেছনে দৌড়াতাম। আমি নিজেই শেফুল ভাইকে বলতাম, “প্রশিক্ষণে অংশ নেবো আমি, সম্মানী আপনি রাখেন; আমার দরকার শেখা।” তাই সে সময় সাংবাদিকতায় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণসহ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি শতাধিক প্রশিক্ষণের সুযোগ হয়েছিল। ঢাকায় ৫ জনের তালিকা প্রেরণ করলে, সেখানেও আমার নামটি থাকতো।

আমরা মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব নিয়ে গর্ব করি। সদস্য হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন, অন্তত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত। তারপরও মাঝেমধ্যে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। সংগঠনের গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী কাজ করায় অতীতে অনেকেই বহিষ্কার হয়েছেন। তবে দুই-একজনের বহিষ্কার নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও রয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্রের ধারা যথাযথভাবে মানা হয়নি বলেও অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। তবে বড় সত্য হলো, চাঁদাবাজদের জায়গা ছিল না। বালুমহাল বা অন্য কোথাও থেকে মাসোহারা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সিলেট বিভাগের মধ্যে এটি ছিল মর্যাদার জায়গা। তবে এটাও সত্য, ২০১৪ সালের পর অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকায় যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন বন্ধু আনহার আহমেদ সমশাদের অনুপ্রেরণাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। সে ছিল আমার রুমমেট। নতুন শহর, নতুন সংগ্রাম—সেই সময়ে তার সাহস ও উৎসাহ আমাকে পথ দেখিয়েছে। তার কাছেও কৃতজ্ঞতা রইল।

মৌলভীবাজারে নজরুল ইসলাম মুহিব ভাই বন্ধুর মতো বিভিন্ন দপ্তরে নিয়ে যেতেন, পরিচয় করিয়ে দিতেন। কাজ শেখার সুযোগ করে দিতেন। আরও অনেকেই নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। ইনশাআল্লাহ তাঁদের কথা ধীরে ধীরে লিখব। যারা আমার পাশে ছিলেন, সবার নাম একসাথে উল্লেখ করতে না পারায় কেউ দয়া করে মন খারাপ করবেন না।

আজকের নতুনদের বলছি, সাংবাদিকতা করো, ভালো কথা; আগে নিউজ লেখা শিখো। নয়তো সাংবাদিক নয়, “সাম্বাদিক” হবে।

বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে স্বশিক্ষিত লিখেছেন। তবে বাস্তবে তিনি যেভাবে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও দক্ষতার সঙ্গে পড়তে ও বলতে পারেন, তা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী ব্যক্তিও পারবেন না।

শিক্ষাগত ডিগ্রি কম হতে পারে, সমস্যা নেই; কিন্তু শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। সাংবাদিকতায় নিজেকে স্বশিক্ষিত করে তুলতে হবে।

আমি এমন সিনিয়র সাংবাদিক দেখেছি, যার এসএসসি সনদও নেই, কিন্তু তাঁর লেখা আমাকে মুগ্ধ করে। হাজার-দুই হাজার শব্দের লেখা নিয়মিত প্রকাশ হয়, পাঠকও প্রচুর। বয়সের শেষ সময়ে কলম চালিয়েই সম্মান ও আয়, দুটোই করছেন। ধান্দাবাজি নয়, দক্ষতা অর্জন করুন।

এখন নতুন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে অনেকেই হঠাৎ বিভিন্ন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকতায় আসা দোষের নয়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু পরিচয় ব্যবহার করে লাভ নেই। নিউজ লিখতে পারেন না, কপি-পেস্ট করছেন, সরকারি অফিসে গিয়ে নেতাগিরি করছেন। প্রশ্ন হলো, বুড়ো বয়সে সাংবাদিকতায় এলে ফিচার লিখেন না কেন? অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। সাংবাদিক নেতা পদবি দিয়ে নয়, মাঠে কাজ করে নেতা হতে হয়।

আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, কোনো কমিটিতে সাংবাদিক প্রতিনিধি রাখা হলে অবশ্যই প্রকৃত সাংবাদিক হতে হবে। যিনি সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত, মাঠে কাজ করেন, যোগাযোগ রাখেন, তাকেই প্রতিনিধি করা উচিত।

আমার যুক্তরাজ্য প্রবাসী বন্ধু কেএম জহির হোসেন মনসুর ১৯৯৮ সালে সাংবাদিকতা শুরু করলেও ধরে রাখেননি। কবি সূর্যদাশ তপন অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সময় বদলায়, কিন্তু পেশার দায় বদলায় না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতায় শুধু সাংবাদিকতা করে সংসার চালানো কঠিন। পাশাপাশি অন্য পেশা থাকা প্রয়োজন। এখন অনেক দৈনিক পত্রিকা সংবাদ প্রতিনিধি নামে বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি নিচ্ছে কমিশন ভিত্তিতে। টেলিভিশন মিডিয়ার অবস্থা আরও ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে বিনা বেতনের প্রতিনিধি দেওয়া হচ্ছে।

অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি থাকলেই লেখক হওয়া যায় না। আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম হলেও অনেকে অসাধারণ লেখেন। লেখালেখি আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা দিয়ে দীর্ঘ পথ চলা সম্ভব নয়। ফেসবুক পোস্ট বা লাইভ করলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর গণমাধ্যম এক নয়।

আপনাদের দোয়ায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত তিনটি জাতীয় দৈনিকে মফস্বল সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে। অনেকেই নিউজ পাঠাতেন। মান ভালো হলে প্রকাশ করেছি, না হলে বাদ দিতে হয়েছে। ফোন করে জানতে চাইতেন, “নিউজ ছাপা হয়নি কেন?” একটাই উত্তর দিতাম, “প্রশিক্ষণ নিন, নিজে লিখুন, অন্যকে লিখতে উৎসাহ দিন।”

অনলাইন নিউজ পোর্টাল pratidin24.com, moulvibazartoday.com, rupantosongbad.com এ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বর্তমানে ebangla71.com সম্পাদক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।

মানে শেষ কথা,
সাংবাদিকতা পরিচয় নয়, দায়িত্ব।
সাংবাদিকতা পদবি নয়, আমানত।

আমার লেখায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

সবাই ভালো থাকুন।
আল্লাহ হাফেজ।

এস এম মেহেদী হাসান
সদস্য, আহ্বায়ক কমিটি
বাংলাদেশ রিপোর্টার কাউন্সিল (BRC)

ভিডিও দেখুন — “খবর প্রকাশ করলে খবর আছে” | সাংবাদিকদের হুমকি এমপি মোবাশ্বেরের | E Bangla 71

ভিডিও দেখুন — ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড ও নতুন উন্নয়ন প্রকল্প | মৌলভীবাজারে সরকারের বড় ঘোষণা

ভিডিও দেখুন — স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য যে খবর দিচ্ছেন নির্বাচন কমিশন | E Bangla 71

Editing Section

এডমিন

এই লেখকের আরও সংবাদ ও আপডেট দেখতে প্রোফাইল ভিজিট করুন।

লেখকের সব সংবাদ দেখুন